Showing posts with label ইসলামি ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label ইসলামি ইতিহাস. Show all posts

Saturday, October 24, 2026

জালুলা ও তিকরিতের যুদ্ধ (৬৩৭) — ইরাক বিজয়ের সমাপ্তি

কাদিসিয়ার পর পারস্য সম্রাট ইয়াজদগার্দ পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সেনাপতিরা তখনও হাল ছাড়েননি। তাঁরা জালুলায় একটি বড় বাহিনী জড়ো করলেন — মাদাইনের পূর্বে, একটি দুর্গের কাছে। তাঁদের আশা ছিল, মুসলিম বাহিনীকে এখানে ঠেকানো যাবে। কিন্তু ইতিহাসের স্রোত তখন অন্য দিকে বইছিল।

মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন হাশিম ইবনে উতবা। তাঁর বাহিনী জালুলার দিকে এগোলো। পারস্য বাহিনী দুর্গের সামনে পরিখা খুঁড়ে প্রতিরক্ষা গড়েছিল — কাদিসিয়ার আগের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা শিখেছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ ছিল তীব্র। যুদ্ধ চললো বেশ কয়েক দিন। শেষ পর্যন্ত পারস্য বাহিনী ভেঙে পড়লো। তাঁদের সেনাপতি মিহরান নিহত হলেন। জালুলা বিজিত হলো।

জালুলার বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী উত্তর দিকে এগোলো — তিকরিতের দিকে। তিকরিত ছিল টাইগ্রিস নদীর তীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, বাইজেন্টাইন ও পারস্য সীমান্তের কাছাকাছি। এখানে রোমান ও পারস্য — দুই পক্ষের সমর্থকরাই ছিলেন। শহরটি ছিল দুর্গের মতো সুরক্ষিত।

তিকরিতের অবরোধ চললো বেশ কিছুদিন — বর্ণনায় চল্লিশ দিনের কথা বলা হয়। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে মুতাম। অবশেষে শহরবাসী সন্ধি করতে রাজি হলো। তিকরিত মুসলিমদের হাতে এলো — শান্তিপূর্ণভাবে, সন্ধির মাধ্যমে।

জালুলা ও তিকরিতের বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইরাকের বিজয় প্রায় সম্পূর্ণ হলো। দক্ষিণে বসরা, মাঝখানে কুফা, উত্তরে মসুলের দিকে পথ খুলে গেল। মুসলিমরা ইরাকে দুটি নতুন শহর গড়লেন — কুফা আর বসরা — যা পরবর্তীকালে ইসলামি সভ্যতার বড় কেন্দ্র হয়ে উঠলো।

এই আঠারোটি যুদ্ধের গল্প — হস্তীর বছর থেকে জালুলা পর্যন্ত — আসলে একটি দীর্ঘ যাত্রার গল্প। শুরু হয়েছিল মক্কার একটি শিশুর জন্মের বছরে, আর শেষ হলো দুটি মহাসাম্রাজ্যের ভাগ্য বদলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। এই যাত্রায় ছিল বিজয়, ছিল পরাজয়, ছিল শাহাদাত, ছিল ক্ষমা। প্রতিটি যুদ্ধই শিখিয়েছে কিছু না কিছু — শৃঙ্খলা, ধৈর্য, কৌশল, নেতৃত্ব, আর সবচেয়ে বড় কথা — আল্লাহর ওপর ভরসা।

এই সিরিজ এখানেই শেষ। তবে ইতিহাস থামে না। ইরাক আর শামের পর মুসলিম বাহিনী এগিয়ে যাবে মিশরের দিকে, পারস্যের গভীরে, আর তারপর আরও দূরে। সেই গল্পগুলো আরেকদিন, আরেক সিরিজে।

জালুলার গুরুত্ব বুঝতে হলে মাদাইনের পরের মানচিত্রটা মনে রাখতে হয়। রাজধানী হারিয়ে সম্রাট ইয়াজদগার্দ পূর্ব দিকে সরে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সেনাপতিরা নতুন করে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছিলেন। জালুলা ছিল সেই চেষ্টার কেন্দ্র — মাদাইনের পূর্বে, পাহাড়ি পথের মুখে, একটি দুর্গের আশ্রয়ে। এখানে টিকে থাকতে পারলে পারস্যরা পূর্বাঞ্চল থেকে নতুন সৈন্য আর রসদ এনে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারতো। তাই জালুলা ছিল শুধু একটি শহরের লড়াই নয়, ছিল প্রশ্ন — পারস্য প্রতিরোধ কি নতুন করে জন্ম নেবে, নাকি কাদিসিয়ার পরাজয়ই শেষ কথা হবে।

জালুলায় পারস্যরা কাদিসিয়ার শিক্ষা কাজে লাগাতে চেয়েছিল। তাঁরা দুর্গের সামনে পরিখা খুঁড়লো, প্রতিরক্ষা মজবুত করলো, আর খোলা ময়দানে মুসলিম অশ্বারোহীদের মুখোমুখি না হয়ে দুর্গের আড়াল থেকে লড়ার পরিকল্পনা নিলো। কিন্তু হাশিম ইবনে উতবার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ধৈর্য হারালো না। তাঁরা পরিখা পেরোনোর পথ খুঁজলেন, দুর্গের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করলেন, আর ধারাবাহিক চাপ দিয়ে পারস্য সারিকে ক্লান্ত করে তুললেন। কয়েক দিনের লড়াইয়ের পর পারস্য প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়লো, সেনাপতি মিহরান নিহত হলেন, আর জালুলার পথ খুলে গেল। এই বিজয় প্রমাণ করলো, কাদিসিয়া কোনো একদিনের ঘটনা ছিল না — মুসলিম বাহিনী দুর্গযুদ্ধেও জিততে পারে।

তিকরিতের গল্পটা ছিল আবার অন্যরকম। এই শহর ছিল টাইগ্রিস নদীর তীরে, উত্তরের পথে। এখানে পারস্য সমর্থক আর রোমান সমর্থক — দুই ধরনের মানুষই থাকতো, আর শহরের চারপাশে ছিল মজবুত প্রাচীর। আবদুল্লাহ ইবনে মুতামের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী শহর অবরোধ করলো। অবরোধ দীর্ঘ হলো, কারণ শহরবাসীর কাছে খাদ্য আর পানির ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা বুঝতে পারলেন, বাইরে থেকে সাহায্য আসার সম্ভাবনা কমে আসছে। শেষ পর্যন্ত সন্ধির পথই সবার জন্য ভালো — শহর অক্ষত থাকবে, মানুষ নিরাপদ থাকবে, আর শাসন বদলাবে শান্তিপূর্ণভাবে। তিকরিতের এই সন্ধি ইরাকের উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো।

জালুলা আর তিকরিতের পর ইরাকের চিত্রটা পুরো বদলে গেল। দক্ষিণে বসরা আর মাঝখানে কুফা — দুটি নতুন শহর গড়ে উঠলো, যা শুধু সেনা ছাউনি ছিল না, হয়ে উঠলো ব্যবসা, শিক্ষা আর প্রশাসনের কেন্দ্র। কুফা থেকে পরিচালিত হতো ইরাকের শাসন, বসরা থেকে চলতো সমুদ্রপথের বাণিজ্য। এই শহরগুলোতে আরব যোদ্ধাদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষও বসতি গড়লো, বাজার বসলো, মসজিদ আর শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি হলো। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরের এই নির্মাণকাজটাই ইরাক বিজয়কে স্থায়ী করেছিল — শুধু ময়দান জেতা যথেষ্ট ছিল না, মানুষের জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে হয়েছিল।

এই আঠারোটি যুদ্ধের সিরিজ থেকে শেষ শিক্ষাটা হলো ধারাবাহিকতার। কোনো একক যুদ্ধেই ইতিহাস বদলায়নি — বদর থেকে উহুদ, খন্দক থেকে ইয়ারমুক, কাদিসিয়া থেকে জালুলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই পরের ধাপের ভিত্তি তৈরি করেছে। কোথাও বিজয় এসেছে, কোথাও পরাজয় শিখিয়েছে, কোথাও সন্ধি পথ খুলে দিয়েছে। আর সব ধাপের পেছনে ছিল একই সূত্র — ঐক্য, ধৈর্য, কৌশল, আর পরাজয় থেকে শেখার মানসিকতা। ইরাক আর শামের বিজয় তাই শুধু মানচিত্রের পরিবর্তন নয়, ছিল একটি নতুন সভ্যতার সূচনা, যার কেন্দ্র হবে কুফা, বসরা, দামেস্ক আর জেরুজালেমের মতো শহরগুলো।

তিকরিতের পর উত্তর ইরাকের পথও খুলে গেল। মসুলের দিকে অভিযান এগোলো, আর টাইগ্রিসের তীর ধরে বাণিজ্য আবার জমে উঠলো। উত্তরের এই অঞ্চল ছিল শাম আর ইরাকের সংযোগস্থল — এখান দিয়ে যেত পাহাড়ি পথ, বাণিজ্য কাফেলা, আর সেনা চলাচলের রাস্তা। তিকরিত দখলে আসার ফলে এই সংযোগস্থলের নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাতে এলো, আর বাইজেন্টাইন সীমান্তের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ তৈরি হলো। পরবর্তীকালে এই অঞ্চল থেকেই উত্তরের আরও অভিযান পরিচালিত হবে, কিন্তু সেই গল্প আরেক অধ্যায়ের।

জালুলা ও তিকরিতের অভিজ্ঞতা থেকে আরও একটি শিক্ষা স্পষ্ট হয় — প্রতিটি অঞ্চলের জন্য একই কৌশল চলে না। জালুলায় প্রয়োজন ছিল দুর্গ ভাঙার ধৈর্য, তিকরিতে প্রয়োজন ছিল অবরোধের ধৈর্য আর সন্ধির প্রস্তুতি। এক জায়গায় যে কৌশল কাজ করেছে, অন্য জায়গায় তা অন্ধভাবে প্রয়োগ করলে ব্যর্থতা আসতো। মুসলিম সেনাপতিরা এই পার্থক্য বুঝেছিলেন বলেই ইরাকের বিজয় এত দ্রুত সম্পূর্ণ হয়েছিল। ইতিহাসের বড় সেনাপতিদের পরিচয় তাঁদের শক্তিতে নয়, পরিস্থিতি পড়ার ক্ষমতায় — আর জালুলা ও তিকরিত সেই ক্ষমতারই দুটি ভিন্ন প্রমাণ।

*মেকার্স অফ হিস্টোরি — ইসলামের সত্য ইতিহাস তুলে ধরে যাবো, ইনশাআল্লাহ।*

ইয়ারমুকের যুদ্ধ (৬৩৬) — শামের ভাগ্য নির্ধারণী লড়াই

শামের ময়দানে তখন উত্তেজনা চরমে। মুসলিম বাহিনী একের পর এক শহর জয় করে এগোচ্ছিল, আর রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস বুঝতে পারছিলেন — এই অগ্রযাত্রা না ঠেকালে শাম হাতছাড়া হবে। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের সব শক্তি একত্র করলেন। বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন থিওডোর — সম্রাটের ভাই — আর আর্মেনীয় সেনাপতি বাহান। তাঁদের বাহিনীর সংখ্যা নিয়ে বর্ণনায় মতভেদ আছে — কেউ বলেন এক লাখের বেশি, কেউ বলেন কম। তবে এটা নিশ্চিত যে, মুসলিম বাহিনীর চেয়ে তাঁরা সংখ্যায় অনেক বড় ছিলেন।

মুসলিম পক্ষে তখন নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়েছিল। আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের পর খলিফা হয়েছিলেন উমর (রা.)। তিনি খালিদ (রা.)-কে সেনাপতির পদ থেকে সরিয়ে আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ (রা.)-কে প্রধান সেনাপতি করেছিলেন। কিন্তু আবু উবাইদা (রা.)-এর মহানুভবতা ছিল অসাধারণ — যুদ্ধের ময়দানে তিনি খালিদ (রা.)-কেই কৌশল নির্ধারণের দায়িত্ব দিলেন। ফলে বাহিনী পেল অভিজ্ঞ নেতা আর ঐক্যবদ্ধ কমান্ড।

দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো ইয়ারমুক নদীর কাছে — উঁচু পাহাড়, গভীর খাদ আর বাতাসের মুখোমুখি প্রান্তর। মুসলিম বাহিনীতে যোদ্ধা ছিলেন প্রায় ছত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আবু সুফিয়ান, আমর ইবনুল আস (রা.), ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.)-এর মতো অভিজ্ঞরা।

যুদ্ধ চললো কয়েক দিন। প্রথম দিনগুলোতে রোমানরা আক্রমণ করলো — বিশেষ করে তাঁদের অশ্বারোহী বাহিনী মুসলিমদের ডান দিক চেপে ধরলো। কিন্তু মুসলিমরা ধৈর্য ধরে রইলেন। খালিদ (রা.) তাঁর অশ্বারোহীদের রিজার্ভ হিসেবে রেখেছিলেন — ঠিক সময়ে আঘাত হানার জন্য।

নির্ণায়ক দিনে খালিদ (রা.) তাঁর পরিকল্পনা কার্যকর করলেন। তিনি রোমান বাহিনীর দুর্বল জায়গাগুলোতে একের পর এক আঘাত হানলেন, আর রোমানদের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। রোমান বাহিনীর একটি বড় অংশ পিছু হটতে গিয়ে খাদের দিকে পড়ে গেল — সেতু ভেঙে যাওয়ায় তাঁদের পালানোর পথ বন্ধ হয়ে গেল। রোমান বাহিনী ভেঙে পড়লো। তাঁদের সেনাপতি বাহান নিহত হলেন বলে বর্ণনা আছে।

ইয়ারমুকের বিজয়ের পর শামের দরজা খুলে গেল। একের পর এক শহর মুসলিমদের হাতে এলো। হেরাক্লিয়াস শাম ছেড়ে কনস্টান্টিনোপলে ফিরে গেলেন — বলা হয়, তিনি শামকে বিদায় জানিয়ে বলেছিলেন, "বিদায়, হে সিরিয়া।" এই একটি যুদ্ধ শামের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।

ইয়ারমুকের শিক্ষা ছিল — নেতৃত্বের পরিবর্তন বাহিনীকে দুর্বল করে না, যদি নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকে। আবু উবাইদা (রা.) আর খালিদ (রা.)-এর সম্পর্ক সেই শিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইয়ারমুকের আগে ও পরে শামের আরও অনেক শহরে লড়াই হয়েছিল। আর এই সিরিজের শেষ পর্বে থাকবে জালুলা ও তিকরিতের গল্প — ইরাক বিজয়ের সমাপ্তি।

ইয়ারমুকের আগে শামের পরিস্থিতি ছিল রোমান সাম্রাজ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সম্রাট হেরাক্লিয়াস সবে পারস্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধ শেষ করে সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিলেন। সেই যুদ্ধে সাম্রাজ্যের অর্থ, সেনা ও প্রশাসন — সবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। শামের শহরগুলোতে রোমান কর ও প্রশাসনের প্রতি স্থানীয় মানুষের ক্ষোভও কম ছিল না। এদিকে মুসলিম বাহিনী শামের বিভিন্ন দিক থেকে এগোচ্ছিল — একদিকে আবু উবাইদা (রা.), অন্যদিকে আমর ইবনুল আস (রা.), ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) ও শুরাহবিল ইবনে হাসানা (রা.)। খালিদ (রা.)-এর পরামর্শ ছিল, বাহিনীগুলো আলাদা আলাদা না লড়ে এক জায়গায় একত্র হোক। সেই সিদ্ধান্তই ইয়ারমুকের ময়দানে সবাইকে একত্র করেছিল।

রোমান বাহিনী ছিল একটি জোটবাহিনী। এর মধ্যে ছিল বাইজেন্টাইন নিয়মিত সেনা, আর্মেনীয় যোদ্ধা এবং গাসসানি আরব মিত্ররা। বর্ণনা অনুযায়ী, বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়েও মতভেদ ছিল — সম্রাটের ভাই থিওডোর ও আর্মেনীয় সেনাপতি বাহান দুজনেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। বিপরীতে মুসলিম বাহিনী ছোট হলেও সংগঠনে ছিল ঐক্যবদ্ধ। বাহিনী ডান, বাম ও কেন্দ্র — এই তিন ভাগে সাজানো হয়েছিল, আর খালিদ (রা.)-এর অধীনে রাখা হয়েছিল একটি চলমান অশ্বারোহী দল, যারা যেকোনো দিকে দ্রুত ছুটে গিয়ে দুর্বল জায়গা সামলাতে পারত। এই "চলমান রক্ষীবাহিনী" ইয়ারমুকের যুদ্ধে বারবার পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল।

যুদ্ধের প্রথম দিনগুলো ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। প্রথমে ছোট ছোট সংঘর্ষ ও একক যোদ্ধাদের লড়াই চলল, তারপর রোমানরা সংগঠিত আক্রমণ শুরু করল। বিশেষ করে রোমান অশ্বারোহীরা মুসলিমদের ডান দিকের ওপর চাপ সৃষ্টি করল। কোনো কোনো মুহূর্তে মুসলিম সারি পিছু হটতে বাধ্য হলো, এমনকি শিবিরের কাছাকাছি চলে এল। বর্ণনা অনুযায়ী, তখন শিবিরের নারীরা পিছু হটা যোদ্ধাদের সাহস জোগালেন এবং তাঁদের আবার ময়দানে ফিরতে উদ্বুদ্ধ করলেন। খালিদ (রা.) তাঁর অশ্বারোহী দল নিয়ে বারবার ভাঙা দিকগুলো জোড়া লাগালেন। এভাবে রোমান আক্রমণের জোয়ার আটকে গেল, কিন্তু কোনো পক্ষই তখনও নির্ণায়ক জয় পায়নি।

নির্ণায়ক দিনে পরিস্থিতি বদলে গেল। খালিদ (রা.) রোমান বাহিনীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা নিলেন। মুসলিম অশ্বারোহীরা রোমানদের বাম দিক ঘুরে পেছনে আঘাত হানল, আর পদাতিক বাহিনী সামনে থেকে চাপ ধরে রাখল। রোমান সারি ভাঙতে শুরু করল। পিছু হটার সময় তাঁদের সামনে পড়ল ইয়ারমুকের খাদ ও সরু পথ। বর্ণনা অনুযায়ী, সেতু ও সংকীর্ণ পথে ভিড় জমে যাওয়ায় বহু রোমান সৈন্য পালাতে পারল না। দিনের শেষে রোমান বাহিনী আর সংগঠিত শক্তি হিসেবে টিকে রইল না। বাইজেন্টাইন সেনাপতিরা নিহত হলেন বা পালিয়ে গেলেন, আর ময়দানের নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাতে এলো।

ইয়ারমুকের পর শামের চিত্র দ্রুত বদলে গেল। রোমান কেন্দ্রীয় বাহিনী আর শামে বড় আকারে প্রতিরোধ গড়তে পারল না। একের পর এক শহর সন্ধি করল বা আত্মসমর্পণ করল। স্থানীয় মানুষের অনেকেই দেখল, নতুন শাসনে তাঁদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে, আর করের বোঝা আগের চেয়ে হালকা। এই কারণে শামের বিজয় শুধু একটি ময়দানের জয় হয়ে রইল না, তা একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিল। ইয়ারমুকের বড় শিক্ষা ছিল নেতৃত্বের শালীনতা ও ঐক্য — পদ বদলালেও উদ্দেশ্য বদলায়নি, অভিজ্ঞতা ও বিনয় একসঙ্গে কাজ করলে ছোট বাহিনীও বড় জোটকে হারাতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে ধৈর্য ধরে সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করা, সংরক্ষিত শক্তিকে অযথা খরচ না করা এবং ভূখণ্ডের সুবিধা বোঝা — এই তিনটি বিষয়ও ইয়ারমুকে স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল। এই কারণেই ইয়ারমুককে শুধু একটি যুদ্ধ নয়, শামের ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে মনে রাখা হয়।

*পরের পর্বে: জালুলা ও তিকরিতের যুদ্ধ (৬৩৭) — ইরাক বিজয়ের সমাপ্তি।*

কাদিসিয়ার যুদ্ধ (৬৩৬) — পারস্য সাম্রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণ

কাদিসিয়া ছিল ইরাকের একটি ছোট শহর, কুফার কাছে। কিন্তু ইতিহাসে এই নামটি হয়ে উঠলো একটি সাম্রাজ্যের পতনের প্রতীক। হিজরি চতুর্দশ সনে এখানে মুখোমুখি হলো দুই বাহিনী — একদিকে সাসানিদ পারস্য সাম্রাজ্যের মূল বাহিনী, অন্যদিকে মুসলিম বাহিনী। এই যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করবে ইরাকের ভবিষ্যৎ, আর পারস্য সাম্রাজ্যের ভাগ্য।

মারজুর রুমের যুদ্ধ (৬৩৫) — শামের পথে আরেকটি বিজয়

দামেস্ক বিজয়ের পর শামের যুদ্ধ শেষ হয়নি। রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস তখনও হাল ছাড়েননি। তিনি দামেস্ক পুনরুদ্ধারের জন্য একটি বাহিনী পাঠালেন — নেতৃত্বে ছিলেন তাঁর ভাই থিওডোর। এই বাহিনী দামেস্কের দিকে এগোচ্ছিল, এমন সময় মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে তাঁদের দেখা হলো মারজুর রুমের প্রান্তরে — "রোমানদের মাঠ" নামের একটি জায়গায়, দামেস্কের কাছাকাছি।

সেতুর যুদ্ধ (৬৩৪) — হাতির সামনে পরাজয় আর ঘুরে দাঁড়ানো

ইরাকের ময়দানে তখন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছিল। খালিদ (রা.) শামের দিকে চলে যাওয়ার পর ইরাকের দায়িত্বে ছিলেন অন্য সেনাপতিরা। সাসানিদরা আবার শক্তি জড়ো করছিল। ফোরাত নদীর তীরে, কুস নাতিফের কাছে, দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো। এই যুদ্ধ ইতিহাসে "সেতুর যুদ্ধ" নামে পরিচিত — কারণ যুদ্ধ হয়েছিল নদীর ওপর তৈরি একটি সেতুর কাছে।

দামেস্ক অবরোধ (৬৩৪) — প্রাচীন শহরের আত্মসমর্পণ

দামেস্ক ছিল শামের প্রাণ। হাজার বছরের পুরনো এই শহরের প্রাচীর ছিল উঁচু, বাজার ছিল সমৃদ্ধ, আর চারপাশে ছিল সবুজ বাগান। রোমান শাসনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল এই শহর। মুসলিম বাহিনী যখন শামের দিকে এগোচ্ছিল, তখন সবাই জানতো — দামেস্ক ছাড়া শাম জয় সম্পূর্ণ হবে না।

আজনাদাইনের যুদ্ধ (৬৩৪) — ফিলিস্তিনের দরজা খোলা

ফিলিস্তিন ছিল শামের দক্ষিণ দিকের প্রবেশদ্বার। জেরুজালেম, গাজা, রামলা — এই শহরগুলো ছিল ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোমানরা জানতো, ফিলিস্তিন হারালে মিশরের পথও বিপদে পড়বে। তাই তাঁরা আজনাদাইনের প্রান্তরে একটি বড় বাহিনী জড়ো করলো — নেতৃত্বে ছিলেন থিওডোর, সম্রাট হেরাক্লিয়াসের ভাই।

সাসানিদ অভিযান (৬৩৩) — ইরাকের ময়দানে খালিদের ঝড়

রিদ্দার যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর খলিফা আবু বকর (রা.) সিদ্ধান্ত নিলেন — এবার সীমান্তের বাইরে যাওয়া হবে। দুটি দিক খোলা ছিল — উত্তরে শাম (সিরিয়া) আর পূর্বে ইরাক। ইরাকের দায়িত্ব দেওয়া হলো খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রায় আঠারো হাজার যোদ্ধা। সামনে ছিল সাসানিদ পারস্য সাম্রাজ্য — শত শত বছরের পুরনো, ধনী আর শক্তিশালী সাম্রাজ্য, কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুর্বল। পারস্য তখন রোমানদের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত, আর রাজদরবারে ক্ষমতার লড়াই চলছিল।

রিদ্দার যুদ্ধ (৬৩২) — ভাঙনের মুখে আরবের ঐক্য রক্ষা

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর আরব উপদ্বীপে যেন ভূমিকম্প হলো। যে ঐক্য তিনি দশ বছরে গড়েছিলেন, তা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো। একদিকে কিছু গোত্র বললো — আমরা নামাজ পড়বো, কিন্তু যাকাত দেবো না। অন্যদিকে কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের নবী বলে দাবি করলো — ইয়ামামায় মুসাইলিমা, নজদে তুলাইহা, আর সাজাহ নামের এক নারীও। কেউ কেউ আবার পুরনো পৌত্তলিকতায় ফিরে গেল।

তাবুক অভিযান (৬৩০) — কষ্টের বাহিনীর দীর্ঘ যাত্রা

হিজরি নবম সন। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম, খেজুর পাকার মৌসুম — মদিনায় তখন ফসল তোলার সময়। ঠিক সেই সময় খবর এলো — উত্তরে রোমান সাম্রাজ্য আরবের দিকে বড় বাহিনী পাঠাচ্ছে। খবরটি সত্যি ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। কিন্তু মদিনার নেতৃত্ব ঝুঁকি নিতে চাইলো না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা দিলেন — উত্তরে যাওয়া হবে।

তায়েফ অভিযান (৬৩০) — অবরোধ, ধৈর্য আর দোয়া

তায়েফ শহরটি ছিল মক্কা থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে, পাহাড়ের ওপর। আবহাওয়া ছিল ঠান্ডা, ফলের বাগান ছিল বিখ্যাত। আর শহরটি ছিল দুর্গের মতো সুরক্ষিত — উঁচু প্রাচীর, মজবুত দরজা, আর ভেতরে প্রচুর খাদ্য মজুত। হুনাইনের পরাজয়ের পর হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্রের অবশিষ্টরা এখানেই আশ্রয় নিয়েছিল।

হুনাইনের যুদ্ধ (৬৩০) — উপত্যকার অতর্কিত আক্রমণ আর ঘুরে দাঁড়ানো

মক্কা বিজয়ের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর। মুসলিম বাহিনী তখন বারো হাজার সৈন্যের বিশাল শক্তি — মদিনার পুরনো সাহাবি আর নতুন মক্কা বিজয়ী মুসলিমরা মিলে। এই সংখ্যা দেখে কারও কারও মনে আত্মবিশ্বাস এসেছিল — এত বড় বাহিনীকে কে হারাবে? কিন্তু ইতিহাস শেখায়, সংখ্যার অহংকার কখনো কখনো বিপদের কারণ হয়।

মক্কা বিজয় (৬৩০) — রক্তপাতহীন মহাবিজয়

হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়েছিল হিজরি ষষ্ঠ সনে। সন্ধির শর্ত ছিল — দশ বছর যুদ্ধ বন্ধ থাকবে, আর যে গোত্র চাইবে, সে মুসলিমদের সঙ্গে বা কুরাইশদের সঙ্গে মিত্রতা করতে পারবে। খুজাআ গোত্র মুসলিমদের মিত্র হলো, আর বকর গোত্র কুরাইশদের। কিন্তু দুই বছর পর বকর গোত্র রাতের অন্ধকারে খুজাআদের ওপর আক্রমণ করলো, আর কুরাইশরা গোপনে তাদের সাহায্য করলো। সন্ধি ভেঙে গেল।

মুতার যুদ্ধ (৬২৯) — তিন সেনাপতির শাহাদাতের ময়দান

হিজরি অষ্টম সন। মদিনা তখন আর ছোট্ট শহর নয় — হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ইসলামের বার্তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন রাজা ও শাসকের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছিলেন। এমনই একটি চিঠি গেল বসরার শাসকের কাছে। কিন্তু পথে, মুতার কাছে, গাসসান গোত্রের শাসক সেই দূতকে হত্যা করলো। সে যুগে দূত হত্যা ছিল যুদ্ধ ঘোষণার শামিল — এটি ছিল আন্তর্জাতিক রীতির চরম লঙ্ঘন।

খন্দকের যুদ্ধ (৬২৭) — পরিখার আড়ালে মহাজোটের পরাজয়

উহুদের পর দুই বছর কেটে গেল। কুরাইশরা বুঝেছিল, একা মদিনাকে হারানো যাবে না। তাই তারা গোটা আরবের গোত্রগুলোকে একত্র করলো — কুরাইশ, গাতফান, সুলাইম, আসাদসহ আরও অনেক গোত্র। এই জোটের সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার — আরবের ইতিহাসে এত বড় জোট এর আগে দেখা যায়নি। তাই এই যুদ্ধের আরেক নাম "গাযওয়াতুল আহযাব" — জোটগুলোর যুদ্ধ। হিজরি পঞ্চম সনে এই মহাজোট মদিনার দিকে রওনা হলো।

উহুদের যুদ্ধ (৬২৫) — বিজয়ের মুখ থেকে কঠিন শিক্ষা

বদরের পরাজয় কুরাইশরা ভুলতে পারেনি। তাদের বড় বড় নেতা নিহত হয়েছিলেন, বাণিজ্যের পথ অনিরাপদ হয়ে পড়েছিল, আর গোটা আরবে তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছিল। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তারা এক বছর ধরে প্রস্তুতি নিলো। হিজরি তৃতীয় সনে, প্রায় তিন হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে আবু সুফিয়ান মদিনার দিকে রওনা হলো। তাদের সঙ্গে ছিল দুইশো ঘোড়া, সাতশো বর্মধারী যোদ্ধা, আর নারীরা — যারা যুদ্ধের সময় গান গেয়ে সৈন্যদের উৎসাহ দিতো।

বদরের যুদ্ধ (৬২৪) — তিনশো তেরো জনের অসম লড়াই

হিজরতের দ্বিতীয় বছর। মদিনায় তখন একটি ছোট্ট মুসলিম সমাজ গড়ে উঠেছে — মুহাজির আর আনসার মিলে একটি পরিবারের মতো। কিন্তু মক্কার কুরাইশরা তাদের শান্তিতে থাকতে দিতে চাইলো না। মদিনা থেকে আসা বাণিজ্য কাফেলাগুলোকে তারা হুমকি মনে করলো, আর মদিনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। এদিকে মদিনায় খবর এলো — আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে একটি বড় বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের নিয়ে সেই কাফেলার পথে বের হলেন।

হস্তীবাহিনীর ঘটনা (৫৭১) — যে বছর হাতি মক্কায় আসেনি

ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহার নাম শুনলে আজও আরবের মানুষের মনে এক অদ্ভুত ঘটনার ছবি ভেসে ওঠে। তিনি ছিলেন একজন ক্ষমতাশালী শাসক, যার হাতে ছিল বিশাল সেনাবাহিনী, আর সেই বাহিনীর সামনে চলতো হাতি — সে যুগের সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধযান। আরবের মরুভূমিতে হাতি ছিল বিরল দৃশ্য। তাই আবরাহার বাহিনী যখন মক্কার দিকে রওনা হলো, তখন গোটা আরব কেঁপে উঠলো।

Search This Blog

Blog Archive