কাদিসিয়ার পর পারস্য সম্রাট ইয়াজদগার্দ পালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সেনাপতিরা তখনও হাল ছাড়েননি। তাঁরা জালুলায় একটি বড় বাহিনী জড়ো করলেন — মাদাইনের পূর্বে, একটি দুর্গের কাছে। তাঁদের আশা ছিল, মুসলিম বাহিনীকে এখানে ঠেকানো যাবে। কিন্তু ইতিহাসের স্রোত তখন অন্য দিকে বইছিল।
মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন হাশিম ইবনে উতবা। তাঁর বাহিনী জালুলার দিকে এগোলো। পারস্য বাহিনী দুর্গের সামনে পরিখা খুঁড়ে প্রতিরক্ষা গড়েছিল — কাদিসিয়ার আগের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা শিখেছিল। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ ছিল তীব্র। যুদ্ধ চললো বেশ কয়েক দিন। শেষ পর্যন্ত পারস্য বাহিনী ভেঙে পড়লো। তাঁদের সেনাপতি মিহরান নিহত হলেন। জালুলা বিজিত হলো।
জালুলার বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী উত্তর দিকে এগোলো — তিকরিতের দিকে। তিকরিত ছিল টাইগ্রিস নদীর তীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, বাইজেন্টাইন ও পারস্য সীমান্তের কাছাকাছি। এখানে রোমান ও পারস্য — দুই পক্ষের সমর্থকরাই ছিলেন। শহরটি ছিল দুর্গের মতো সুরক্ষিত।
তিকরিতের অবরোধ চললো বেশ কিছুদিন — বর্ণনায় চল্লিশ দিনের কথা বলা হয়। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে মুতাম। অবশেষে শহরবাসী সন্ধি করতে রাজি হলো। তিকরিত মুসলিমদের হাতে এলো — শান্তিপূর্ণভাবে, সন্ধির মাধ্যমে।
জালুলা ও তিকরিতের বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইরাকের বিজয় প্রায় সম্পূর্ণ হলো। দক্ষিণে বসরা, মাঝখানে কুফা, উত্তরে মসুলের দিকে পথ খুলে গেল। মুসলিমরা ইরাকে দুটি নতুন শহর গড়লেন — কুফা আর বসরা — যা পরবর্তীকালে ইসলামি সভ্যতার বড় কেন্দ্র হয়ে উঠলো।
এই আঠারোটি যুদ্ধের গল্প — হস্তীর বছর থেকে জালুলা পর্যন্ত — আসলে একটি দীর্ঘ যাত্রার গল্প। শুরু হয়েছিল মক্কার একটি শিশুর জন্মের বছরে, আর শেষ হলো দুটি মহাসাম্রাজ্যের ভাগ্য বদলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। এই যাত্রায় ছিল বিজয়, ছিল পরাজয়, ছিল শাহাদাত, ছিল ক্ষমা। প্রতিটি যুদ্ধই শিখিয়েছে কিছু না কিছু — শৃঙ্খলা, ধৈর্য, কৌশল, নেতৃত্ব, আর সবচেয়ে বড় কথা — আল্লাহর ওপর ভরসা।
এই সিরিজ এখানেই শেষ। তবে ইতিহাস থামে না। ইরাক আর শামের পর মুসলিম বাহিনী এগিয়ে যাবে মিশরের দিকে, পারস্যের গভীরে, আর তারপর আরও দূরে। সেই গল্পগুলো আরেকদিন, আরেক সিরিজে।
জালুলার গুরুত্ব বুঝতে হলে মাদাইনের পরের মানচিত্রটা মনে রাখতে হয়। রাজধানী হারিয়ে সম্রাট ইয়াজদগার্দ পূর্ব দিকে সরে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সেনাপতিরা নতুন করে ঘাঁটি গড়ার চেষ্টা করছিলেন। জালুলা ছিল সেই চেষ্টার কেন্দ্র — মাদাইনের পূর্বে, পাহাড়ি পথের মুখে, একটি দুর্গের আশ্রয়ে। এখানে টিকে থাকতে পারলে পারস্যরা পূর্বাঞ্চল থেকে নতুন সৈন্য আর রসদ এনে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারতো। তাই জালুলা ছিল শুধু একটি শহরের লড়াই নয়, ছিল প্রশ্ন — পারস্য প্রতিরোধ কি নতুন করে জন্ম নেবে, নাকি কাদিসিয়ার পরাজয়ই শেষ কথা হবে।
জালুলায় পারস্যরা কাদিসিয়ার শিক্ষা কাজে লাগাতে চেয়েছিল। তাঁরা দুর্গের সামনে পরিখা খুঁড়লো, প্রতিরক্ষা মজবুত করলো, আর খোলা ময়দানে মুসলিম অশ্বারোহীদের মুখোমুখি না হয়ে দুর্গের আড়াল থেকে লড়ার পরিকল্পনা নিলো। কিন্তু হাশিম ইবনে উতবার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ধৈর্য হারালো না। তাঁরা পরিখা পেরোনোর পথ খুঁজলেন, দুর্গের দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করলেন, আর ধারাবাহিক চাপ দিয়ে পারস্য সারিকে ক্লান্ত করে তুললেন। কয়েক দিনের লড়াইয়ের পর পারস্য প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়লো, সেনাপতি মিহরান নিহত হলেন, আর জালুলার পথ খুলে গেল। এই বিজয় প্রমাণ করলো, কাদিসিয়া কোনো একদিনের ঘটনা ছিল না — মুসলিম বাহিনী দুর্গযুদ্ধেও জিততে পারে।
তিকরিতের গল্পটা ছিল আবার অন্যরকম। এই শহর ছিল টাইগ্রিস নদীর তীরে, উত্তরের পথে। এখানে পারস্য সমর্থক আর রোমান সমর্থক — দুই ধরনের মানুষই থাকতো, আর শহরের চারপাশে ছিল মজবুত প্রাচীর। আবদুল্লাহ ইবনে মুতামের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী শহর অবরোধ করলো। অবরোধ দীর্ঘ হলো, কারণ শহরবাসীর কাছে খাদ্য আর পানির ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা বুঝতে পারলেন, বাইরে থেকে সাহায্য আসার সম্ভাবনা কমে আসছে। শেষ পর্যন্ত সন্ধির পথই সবার জন্য ভালো — শহর অক্ষত থাকবে, মানুষ নিরাপদ থাকবে, আর শাসন বদলাবে শান্তিপূর্ণভাবে। তিকরিতের এই সন্ধি ইরাকের উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো।
জালুলা আর তিকরিতের পর ইরাকের চিত্রটা পুরো বদলে গেল। দক্ষিণে বসরা আর মাঝখানে কুফা — দুটি নতুন শহর গড়ে উঠলো, যা শুধু সেনা ছাউনি ছিল না, হয়ে উঠলো ব্যবসা, শিক্ষা আর প্রশাসনের কেন্দ্র। কুফা থেকে পরিচালিত হতো ইরাকের শাসন, বসরা থেকে চলতো সমুদ্রপথের বাণিজ্য। এই শহরগুলোতে আরব যোদ্ধাদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষও বসতি গড়লো, বাজার বসলো, মসজিদ আর শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি হলো। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরের এই নির্মাণকাজটাই ইরাক বিজয়কে স্থায়ী করেছিল — শুধু ময়দান জেতা যথেষ্ট ছিল না, মানুষের জীবনকে নতুনভাবে সাজাতে হয়েছিল।
এই আঠারোটি যুদ্ধের সিরিজ থেকে শেষ শিক্ষাটা হলো ধারাবাহিকতার। কোনো একক যুদ্ধেই ইতিহাস বদলায়নি — বদর থেকে উহুদ, খন্দক থেকে ইয়ারমুক, কাদিসিয়া থেকে জালুলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই পরের ধাপের ভিত্তি তৈরি করেছে। কোথাও বিজয় এসেছে, কোথাও পরাজয় শিখিয়েছে, কোথাও সন্ধি পথ খুলে দিয়েছে। আর সব ধাপের পেছনে ছিল একই সূত্র — ঐক্য, ধৈর্য, কৌশল, আর পরাজয় থেকে শেখার মানসিকতা। ইরাক আর শামের বিজয় তাই শুধু মানচিত্রের পরিবর্তন নয়, ছিল একটি নতুন সভ্যতার সূচনা, যার কেন্দ্র হবে কুফা, বসরা, দামেস্ক আর জেরুজালেমের মতো শহরগুলো।
তিকরিতের পর উত্তর ইরাকের পথও খুলে গেল। মসুলের দিকে অভিযান এগোলো, আর টাইগ্রিসের তীর ধরে বাণিজ্য আবার জমে উঠলো। উত্তরের এই অঞ্চল ছিল শাম আর ইরাকের সংযোগস্থল — এখান দিয়ে যেত পাহাড়ি পথ, বাণিজ্য কাফেলা, আর সেনা চলাচলের রাস্তা। তিকরিত দখলে আসার ফলে এই সংযোগস্থলের নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাতে এলো, আর বাইজেন্টাইন সীমান্তের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ তৈরি হলো। পরবর্তীকালে এই অঞ্চল থেকেই উত্তরের আরও অভিযান পরিচালিত হবে, কিন্তু সেই গল্প আরেক অধ্যায়ের।
জালুলা ও তিকরিতের অভিজ্ঞতা থেকে আরও একটি শিক্ষা স্পষ্ট হয় — প্রতিটি অঞ্চলের জন্য একই কৌশল চলে না। জালুলায় প্রয়োজন ছিল দুর্গ ভাঙার ধৈর্য, তিকরিতে প্রয়োজন ছিল অবরোধের ধৈর্য আর সন্ধির প্রস্তুতি। এক জায়গায় যে কৌশল কাজ করেছে, অন্য জায়গায় তা অন্ধভাবে প্রয়োগ করলে ব্যর্থতা আসতো। মুসলিম সেনাপতিরা এই পার্থক্য বুঝেছিলেন বলেই ইরাকের বিজয় এত দ্রুত সম্পূর্ণ হয়েছিল। ইতিহাসের বড় সেনাপতিদের পরিচয় তাঁদের শক্তিতে নয়, পরিস্থিতি পড়ার ক্ষমতায় — আর জালুলা ও তিকরিত সেই ক্ষমতারই দুটি ভিন্ন প্রমাণ।
*মেকার্স অফ হিস্টোরি — ইসলামের সত্য ইতিহাস তুলে ধরে যাবো, ইনশাআল্লাহ।*






























