Saturday, October 24, 2026

সাসানিদ অভিযান (৬৩৩) — ইরাকের ময়দানে খালিদের ঝড়

রিদ্দার যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর খলিফা আবু বকর (রা.) সিদ্ধান্ত নিলেন — এবার সীমান্তের বাইরে যাওয়া হবে। দুটি দিক খোলা ছিল — উত্তরে শাম (সিরিয়া) আর পূর্বে ইরাক। ইরাকের দায়িত্ব দেওয়া হলো খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রায় আঠারো হাজার যোদ্ধা। সামনে ছিল সাসানিদ পারস্য সাম্রাজ্য — শত শত বছরের পুরনো, ধনী আর শক্তিশালী সাম্রাজ্য, কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুর্বল। পারস্য তখন রোমানদের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধে ক্লান্ত, আর রাজদরবারে ক্ষমতার লড়াই চলছিল।

খালিদ (রা.) ইরাকের দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবেশ করলেন। প্রথম বড় যুদ্ধ হলো "জাতুস সালাসিল" — শৃঙ্খলের যুদ্ধ। পারস্য বাহিনীর সৈন্যরা নিজেদের শৃঙ্খল দিয়ে বেঁধে নিয়েছিল, যাতে কেউ পালাতে না পারে। কিন্তু সেই শৃঙ্খলই তাদের বিপদ ডেকে আনলো — পরাজয়ের সময় তারা পালাতে পারলো না। এরপর একে একে নদীর যুদ্ধ, ওয়ালাজার যুদ্ধ, উল্লাইসের যুদ্ধ — প্রতিটি যুদ্ধেই খালিদ (রা.)-এর কৌশল জয়ী হলো।

ওয়ালাজার যুদ্ধ ছিল বিশেষভাবে বিখ্যাত। পারস্য বাহিনী সংখ্যায় অনেক বড় ছিল, আর তাদের দুই পাশে ছিল জলাভূমি। খালিদ (রা.) তাঁর বাহিনীকে দুই ভাগে ভাগ করলেন — একটি দল সামনে থেকে আক্রমণ করলো, আরেকটি দল ঘুরে পেছন থেকে আঘাত হানলো। পারস্য বাহিনী দুই দিকের চাপে ভেঙে পড়লো। এই "দ্বিমুখী আক্রমণ" খালিদ (রা.)-এর স্বাক্ষর কৌশল হয়ে উঠলো।

এরপর মুসলিম বাহিনী হিরার দিকে এগোলো। হিরা ছিল ইরাকের একটি প্রাচীন ও ধনী শহর, আরব খ্রিষ্টান রাজ্য লাখমিদের রাজধানী। হিরার মানুষ আত্মসমর্পণ করলো — তাঁদের সঙ্গে সন্ধি হলো, তাঁরা জিজিয়া দিতে রাজি হলো, আর মুসলিমরা তাঁদের জানমালের নিরাপত্তা দিলো। হিরা বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চল মুসলিমদের হাতে এলো।

কিন্তু সাসানিদরা তখনও শেষ হয়নি। তাঁরা আরও বাহিনী জড়ো করলো। এরপরের বছরগুলোতে ইরাকে আরও বড় যুদ্ধ হলো — সেতুর যুদ্ধে মুসলিমরা পরাজিত হলো, কাদিসিয়ায় জয়ী হলো, আর শেষ পর্যন্ত পারস্য সাম্রাজ্যের পতন হলো। কিন্তু ৬৩৩ সালের অভিযানই ছিল সেই দীর্ঘ যাত্রার সূচনা।

এই অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ব্যবহার। মুসলিমরা যেখানে গেলেন, সেখানে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করলেন না। কৃষকরা নিজেদের জমিতে কাজ করতে থাকলো, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা চালিয়ে গেল। এই নীতির কারণে অনেক শহর যুদ্ধ ছাড়াই সন্ধি করতে রাজি হলো।

খালিদ (রা.)-কে অবশ্য ইরাকে বেশিদিন থাকতে হয়নি। শামের দিকে পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় খলিফা তাঁকে সিরিয়ার দিকে ডেকে পাঠালেন। ইরাকের দায়িত্ব অন্যদের হাতে গেল। কিন্তু ইরাকের ময়দানে তাঁর ঝড়ের গতি তখনও থামেনি — সেই ঝড় এবার শামের দিকে বইতে চলেছিল, আর তার প্রথম বড় পরীক্ষা হবে ইয়ারমুকের প্রান্তরে।

সাসানিদ সাম্রাজ্যের দিকে তাকালে বাইরে থেকে মনে হতো, এটি এখনও অজেয়। কিন্তু ভেতরের চিত্র ছিল ভিন্ন। রোমানদের সঙ্গে প্রায় পঁচিশ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধ সাম্রাজ্যের কোষাগার খালি করে দিয়েছিল। সম্রাট দ্বিতীয় খসরুর পতনের পর রাজদরবারে একের পর এক শাসক আসতে লাগলেন, কেউ বেশিদিন টিকলেন না। প্রদেশগুলোর শাসকেরা নিজেদের স্বার্থ দেখতে শুরু করলেন, আর কেন্দ্রের নির্দেশ আগের মতো মানা হচ্ছিল না। আরব সীমান্তে পুরনো লাখমিদ মিত্ররাজ্যও তখন আর আগের মতো শক্তিশালী ছিল না। ফলে দক্ষিণ ইরাকের উর্বর ভূমি, ইউফ্রেটিস নদীর বাণিজ্যপথ ও শস্যভাণ্ডার রক্ষা করার মতো ঐক্যবদ্ধ শক্তি পারস্যের হাতে কমে গিয়েছিল।

ইরাকে মুসলিম অগ্রযাত্রা হঠাৎ শুরু হয়নি। রিদ্দার যুদ্ধ চলাকালেই মুসান্না ইবনে হারিসা (রা.)-এর নেতৃত্বে সীমান্তে ছোট ছোট অভিযান চলছিল। খালিদ (রা.) ইয়ামামা থেকে এসে সেই অভিযানকে বড় আকার দিলেন। তাঁর কৌশল ছিল গতি ও চমক। তিনি এক জায়গায় দীর্ঘ অবরোধে আটকে না থেকে শত্রুর বাহিনীকে ময়দানে টেনে এনে পরাজিত করতে চাইতেন। ইউফ্রেটিসের তীর ধরে এগোনোর ফলে তাঁর বাহিনী পানির সরবরাহ ও চলাচলের সুবিধা পেত, আর পারস্যের সীমান্ত চৌকিগুলো একে একে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত। এই গতিশীল যুদ্ধপদ্ধতি সংখ্যায় ছোট বাহিনীকেও বড় বাহিনীর বিরুদ্ধে সুবিধা দিয়েছিল।

শৃঙ্খলের যুদ্ধ ও ওয়ালাজার পর আরও কয়েকটি কঠিন লড়াই হলো। উল্লাইসের যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী — বর্ণনায় একে "রক্তের নদী" বলা হয়েছে, কারণ যুদ্ধক্ষেত্রের পাশের খাল রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল বলে বর্ণনা আছে। এরপর আনবারের দিকে অগ্রসর হলো মুসলিম বাহিনী। আনবার ছিল প্রাচীরঘেরা শক্তিশালী দুর্গ। বর্ণনা অনুযায়ী, মুসলিম তীরন্দাজরা এত নিখুঁতভাবে তীর ছুড়েছিলেন যে দুর্গের প্রহরীদের চোখ লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছিল, আর এই কারণে এই লড়াই "চোখের যুদ্ধ" নামেও পরিচিত। আইন আত-তামর ও দাউমাতুল জানদালের মতো মরু-সীমান্তের কেন্দ্রগুলো দখল হওয়ার পর দক্ষিণ ইরাকের সঙ্গে উত্তর আরবের সংযোগ আরও নিরাপদ হলো।

হিরার সন্ধি এই অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। হিরা শুধু ধনী শহর ছিল না, এটি ছিল আরব খ্রিষ্টানদের প্রাচীন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সেখানকার মানুষের সঙ্গে চুক্তি হলো — তাঁরা নির্দিষ্ট কর দেবেন, আর মুসলিম শাসন তাঁদের জীবন, সম্পদ ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা দেবে। স্থানীয় প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে আগের মতোই চলতে থাকল, কৃষকরা জমিতে ফিরে গেলেন, ব্যবসায়ীরা বাজার খুললেন। এই নীতির ফলে হিরার পতন রক্তপাত ছাড়াই সম্পন্ন হলো এবং আশপাশের শহরগুলোও সন্ধির পথ বেছে নিতে উৎসাহ পেল। যুদ্ধজয়ের পাশাপাশি এই প্রশাসনিক ধৈর্যই ইরাকে মুসলিম উপস্থিতিকে টেকসই করেছিল।

খালিদ (রা.)-এর ইরাক অধ্যায় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, কিন্তু এর প্রভাব দীর্ঘ ছিল। শামে রোমান চাপ বাড়লে খলিফা তাঁকে সেদিকে ডেকে পাঠান, আর তিনি মরুপথ ধরে দ্রুত সিরিয়ার দিকে রওনা হন — যা তাঁর জীবনের অন্যতম বিখ্যাত অভিযাত্রা হিসেবে বর্ণিত হয়। ইরাকের দায়িত্ব মুসান্না (রা.) ও অন্য সেনাপতিদের হাতে থাকল। পরের বছরগুলোতে সেখানে পরাজয়ও এসেছিল, বিশেষ করে সেতুর যুদ্ধে, কিন্তু ৬৩৩ সালের অভিযান ইরাকের দরজা খুলে দিয়েছিল। এই অভিযানের শিক্ষা ছিল স্পষ্ট — দুর্বল কেন্দ্রীয় শাসন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ক্লান্ত সেনাবাহিনী যত বড় সাম্রাজ্যই হোক, তাকে ভঙ্গুর করে দেয়; আর গতি, স্থানীয় মানুষের আস্থা ও সন্ধির নীতি যুদ্ধের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়। ইরাকের উর্বর জমি ও নদীপথ দখল হওয়ার ফলে মুসলিম রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিও মজবুত হলো, আর সীমান্তের নিরাপত্তা আগের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত হলো। তাই ৬৩৩ সালের অভিযানকে শুধু কয়েকটি যুদ্ধজয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে — এটি ছিল একটি সাম্রাজ্যের ভেতরে ঢোকার প্রথম স্থায়ী পদক্ষেপ।

*পরের পর্বে: আজনাদাইনের যুদ্ধ (৬৩৪) — ফিলিস্তিনের দরজা খোলা।*

No comments:

Post a Comment

Search This Blog

Blog Archive