মক্কা বিজয়ের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর। মুসলিম বাহিনী তখন বারো হাজার সৈন্যের বিশাল শক্তি — মদিনার পুরনো সাহাবি আর নতুন মক্কা বিজয়ী মুসলিমরা মিলে। এই সংখ্যা দেখে কারও কারও মনে আত্মবিশ্বাস এসেছিল — এত বড় বাহিনীকে কে হারাবে? কিন্তু ইতিহাস শেখায়, সংখ্যার অহংকার কখনো কখনো বিপদের কারণ হয়।
হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্রের নেতা মালিক ইবনে আওফ তাঁর গোত্রগুলোকে জড়ো করেছিলেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল, মক্কা বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী যখন হুনাইনের উপত্যকার মধ্য দিয়ে যাবে, তখন উপত্যকার দুই পাশের পাহাড় থেকে অতর্কিত আক্রমণ করা হবে। তাঁরা নিজেদের পরিবার, ধনসম্পদ আর পশুপাল পর্যন্ত সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন — যাতে সৈন্যরা পিছু হটতে না পারে, সবকিছু বাজি রেখে লড়তে হয়।
সকালের কুয়াশা ভেদ করে মুসলিম বাহিনী উপত্যকায় ঢুকলো। হঠাৎ দুই পাশ থেকে তীর বৃষ্টি শুরু হলো। সামনের সারির সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পিছু হটতে লাগলো। বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লো। বাহিনীর একটি বড় অংশ পালিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর খচ্চরের ওপর স্থির দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চারপাশে ছিলেন মাত্র অল্প কয়েকজন — আব্বাস (রা.), আলি (রা.), আবু সুফিয়ান ইবনে হারিসসহ হাতেগোনা কয়েকজন। আব্বাস (রা.)-এর ছিল উঁচু কণ্ঠ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ডাক দিতে বললেন — আনসারদের, বাইআতুর রিদওয়ানের সঙ্গীদের। সেই ডাক শুনে পিছু হটা সৈন্যরা ফিরে আসতে লাগলো — প্রথমে দশজন, তারপর একশো, তারপর দলে দলে।
যুদ্ধের মোড় ঘুরে গেল। মুসলিম বাহিনী আবার সংগঠিত হলো। হাওয়াজিন বাহিনী ভেঙে পড়লো। তাদের পরিবার, পশুপাল আর বিপুল গনিমত মুসলিমদের হাতে এলো। যুদ্ধের পর গনিমত বণ্টন নিয়ে কিছু অসন্তোষ দেখা দিলো — বিশেষ করে নতুন মক্কা বিজয়ী মুসলিমদের বেশি দেওয়া নিয়ে আনসারদের মধ্যে প্রশ্ন উঠলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের ডেকে আবেগঘন ভাষায় বললেন, তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, মানুষ উট-ছাগল নিয়ে ফিরবে, আর তোমরা রাসুলুল্লাহকে নিয়ে ফিরবে? আনসাররা কেঁদে বললেন, আমরা সন্তুষ্ট।
হুনাইনের শিক্ষা ছিল স্পষ্ট — বিজয় আসে সংখ্যা দিয়ে নয়, আসে ঈমান, শৃঙ্খলা আর আল্লাহর ওপর ভরসা দিয়ে। কুরআনে হুনাইনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সংখ্যার আধিক্য সেদিন কোনো কাজে আসেনি, কিন্তু আল্লাহর সাহায্য এসেছিল।
হুনাইনের পর হাওয়াজিনদের একটি অংশ তায়েফে আশ্রয় নিলো। মুসলিম বাহিনী তাঁদের পিছু নিয়ে তায়েফের দিকে রওনা হলো — সেই শহর, যেখানে একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাথর মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
হুনাইনের যুদ্ধ বোঝার জন্য আগে বুঝতে হবে, মক্কা বিজয়ের পর আরবের রাজনৈতিক মানচিত্রটা কেমন বদলে গিয়েছিল। মক্কা এতদিন ছিল আরবের ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। সেই শহর যখন প্রায় বিনা রক্তপাতে মুসলিমদের হাতে এলো, তখন আশপাশের বড় গোত্রগুলোর মধ্যে একই সঙ্গে ভয় আর সন্দেহ জন্মাল। হাওয়াজিন ছিল মক্কা ও তায়েফের মাঝামাঝি অঞ্চলের একটি শক্তিশালী গোত্রজোট। তাদের সঙ্গে যোগ দিল সাকিফ গোত্র, যারা তায়েফের অধিবাসী ছিল। তাদের নেতা মালিক ইবনে আওফ ছিলেন তরুণ, সাহসী আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি বুঝেছিলেন, আলাদা আলাদা লড়লে মুসলিম বাহিনীর সামনে টেকা যাবে না। তাই তিনি হাওয়াজিনের বিভিন্ন শাখা — নসর, জুশাম, সাদ ইবনে বকরসহ আরও অনেক গোত্রকে এক পতাকার নিচে আনলেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল খুব স্পষ্ট: অপেক্ষা না করে আগেই আঘাত করা, যাতে মুসলিম বাহিনী তায়েফের দিকে এগোনোর আগেই তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়া যায়।
মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা ছিল সত্যিই চোখ ধাঁধানো। মদিনা থেকে আসা পুরনো বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন মক্কা বিজয়ের পর নতুন ইসলাম গ্রহণ করা প্রায় দুই হাজার মানুষ। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছিল প্রায় বারো হাজারে। এত বড় বাহিনী এর আগে মুসলিমরা কখনো মাঠে নামাননি। এই সংখ্যা অনেকের মনে এমন এক আত্মবিশ্বাস এনে দিল, যা প্রায় আত্মতুষ্টিতে পরিণত হলো। কেউ কেউ মনে মনে ভাবলেন, এত মানুষ থাকতে হারার প্রশ্নই ওঠে না। ইতিহাসের শিক্ষা অবশ্য অন্য কথা বলে। সংখ্যা যখন মানুষের ভরসার একমাত্র জায়গা হয়ে যায়, তখন শৃঙ্খলা, সতর্কতা আর আল্লাহর ওপর নির্ভরতা আড়ালে চলে যায়। হুনাইনের সকাল সেই সত্যটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে হুনাইন ছিল শত্রুর জন্য আদর্শ জায়গা। এটি ছিল একটি সরু উপত্যকা, মক্কা থেকে তায়েফের পথে। দুই পাশে উঁচু পাহাড় আর গিরিপথ। মালিক ইবনে আওফ রাতের অন্ধকারেই তাঁর তীরন্দাজদের সেই পাহাড়ি গিরিপথে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আরও একটি কৌশল ছিল তাঁর: সৈন্যদের সঙ্গে আনা হয়েছিল তাদের স্ত্রী, সন্তান, ধনসম্পদ আর পশুপাল। উদ্দেশ্য ছিল, কেউ যেন পালানোর কথা ভাবতেও না পারে। পেছনে নিজের পরিবার থাকলে মানুষ শেষ পর্যন্ত লড়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই মুসলিম বাহিনীর অগ্রবর্তী দল উপত্যকায় ঢুকে পড়ল। হঠাৎ দুই পাশ থেকে তীর ছুটে এলো। ঘোড়াগুলো ভয় পেয়ে ছোটাছুটি শুরু করল। সামনের সারি পেছনের সারির ওপর এসে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে শৃঙ্খলা ভেঙে গেল, আর একটি বড় অংশ পিছু হটতে শুরু করল।
কিন্তু একটি বাহিনীর আসল পরিচয় ধরা পড়ে বিপদের মুহূর্তে, বিজয়ের মুহূর্তে নয়। সেই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যেও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর বাহন থেকে নামলেন না, পিছু হটলেন না। তাঁর চারপাশে তখন মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন সাহাবি। বর্ণনামতে, তিনি একমুঠো মাটি শত্রুর দিকে ছুড়ে দিয়েছিলেন। তারপর আব্বাস (রা.)-কে ডাক দিতে বললেন। আব্বাস (রা.)-এর কণ্ঠ ছিল খুব উঁচু ও স্পষ্ট। তিনি আনসারদের ডাকলেন, বাইআতুর রিদওয়ানের সঙ্গীদের ডাকলেন, যাঁরা একদিন গাছের নিচে জীবন বাজি রাখার অঙ্গীকার করেছিলেন। সেই ডাক উপত্যকায় প্রতিধ্বনিত হলো। প্রথমে অল্প কয়েকজন ফিরলেন, তারপর দলে দলে। যাঁরা পালাচ্ছিলেন, তাঁরা থমকে দাঁড়ালেন, ঘুরে তাকালেন, আর ফিরে এলেন। ধীরে ধীরে মুসলিম বাহিনী আবার সারি বাঁধল। এবার আক্রমণটা হলো সংগঠিতভাবে। হাওয়াজিন বাহিনী সেই চাপ সামলাতে পারল না। তাদের একটি অংশ আওতাসের দিকে, একটি অংশ নাখলার দিকে, আর একটি অংশ তায়েফের দিকে পালিয়ে গেল।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল গনিমত নিয়ে। বর্ণনামতে, জি'রানা নামের জায়গায় জমা করা হলো বিপুল পরিমাণ পশুপাল আর বন্দি — প্রায় চব্বিশ হাজার উট, কমবেশি চল্লিশ হাজার ছাগল আর প্রায় ছয় হাজার বন্দির কথা বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। তবে সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সিদ্ধান্তের ধরন। রাসুলুল্লাহ (সা.) সঙ্গে সঙ্গে গনিমত বণ্টন করলেন না। তিনি অপেক্ষা করলেন, হাওয়াজিনদের প্রতিনিধি দল আসবে কি না, দেখার জন্য। তায়েফ অভিযানের পর যখন সেই প্রতিনিধি দল এলো, তখন তাদের সামনে দুটি জিনিসের একটি বেছে নিতে বলা হলো — পরিবার, না সম্পদ। তারা পরিবার বেছে নিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের ভাগের বন্দিদের ফিরিয়ে দিলেন, আর সাহাবিদেরও অনুরোধ করলেন একই কাজ করতে। অধিকাংশই সাড়া দিলেন। এই একটি সিদ্ধান্ত হাওয়াজিনদের মন জয় করে নিল। যারা সকালে শত্রু ছিল, তারা অল্পদিনের মধ্যেই মুসলিম ভাই হয়ে গেল। হুনাইনের তাই দুটি শিক্ষা: যুদ্ধক্ষেত্রে সংখ্যা নয়, শৃঙ্খলা আর নেতৃত্বই মোড় ঘুরিয়ে দেয়; আর বিজয়ের পর ক্ষমা আর উদারতাই শত্রুকে বন্ধু বানায়।
*পরের পর্বে: তায়েফ অভিযান (৬৩০) — অবরোধ, ধৈর্য আর দোয়া।*













No comments:
Post a Comment