Saturday, October 24, 2026

উহুদের যুদ্ধ (৬২৫) — বিজয়ের মুখ থেকে কঠিন শিক্ষা

বদরের পরাজয় কুরাইশরা ভুলতে পারেনি। তাদের বড় বড় নেতা নিহত হয়েছিলেন, বাণিজ্যের পথ অনিরাপদ হয়ে পড়েছিল, আর গোটা আরবে তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছিল। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে তারা এক বছর ধরে প্রস্তুতি নিলো। হিজরি তৃতীয় সনে, প্রায় তিন হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনী নিয়ে আবু সুফিয়ান মদিনার দিকে রওনা হলো। তাদের সঙ্গে ছিল দুইশো ঘোড়া, সাতশো বর্মধারী যোদ্ধা, আর নারীরা — যারা যুদ্ধের সময় গান গেয়ে সৈন্যদের উৎসাহ দিতো।

মদিনায় পরামর্শ সভা বসলো। কেউ বললেন শহরের ভেতরে থেকে প্রতিরোধ করা হোক, কেউ বললেন বাইরে গিয়ে মোকাবিলা করা হোক। বিশেষ করে যারা বদরে অংশ নিতে পারেননি, তাঁরা বাইরে গিয়ে যুদ্ধের পক্ষে জোরালো মত দিলেন। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো — বাহিনী বাইরে যাবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় সাতশো যোদ্ধা নিয়ে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান নিলেন। সংখ্যার ব্যবধান ছিল প্রায় চার গুণ।

যুদ্ধের পরিকল্পনায় একটি ছোট পাহাড়ি টিলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেই টিলার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পঞ্চাশ জন তিরন্দাজকে বসালেন, নেতা আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)। নির্দেশ ছিল পরিষ্কার — জয় হোক বা পরাজয়, কোনো অবস্থাতেই এই জায়গা ছাড়া যাবে না। পেছন দিক থেকে শত্রুর আক্রমণ ঠেকানোই ছিল তাঁদের কাজ।

যুদ্ধ শুরু হলো। প্রথম ধাক্কায় মুসলিম বাহিনী কুরাইশদের পিছু হটিয়ে দিলো। কুরাইশ শিবিরে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো। বিজয় যেন হাতের মুঠোয়। ঠিক তখনই ঘটলো সেই ভুল, যা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তিরন্দাজদের অনেকেই ভাবলেন যুদ্ধ শেষ — তাঁরা গনিমত সংগ্রহের জন্য টিলা ছেড়ে নিচে নেমে এলেন। আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) বাধা দিলেন, কিন্তু অল্প কয়েকজন ছাড়া সবাই নেমে গেলেন।

এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ — তখনও তিনি কুরাইশ পক্ষে, ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে খালি টিলার পাশ দিয়ে ঘুরে মুসলিম বাহিনীর পেছনে আঘাত হানলেন। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি উল্টে গেল। সামনে থেকে পিছু হটা কুরাইশরা ফিরে এলো, পেছন থেকে আঘাত এলো — মুসলিম বাহিনী দুই দিক থেকে চাপে পড়লো। বিশৃঙ্খলার মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহিদ হয়েছেন।

বাস্তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত হয়েছিলেন — তাঁর দাঁত ভেঙেছিল, মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়েছিল। কিন্তু তিনি জীবিত ছিলেন। সাহাবিরা তাঁকে ঘিরে পাহাড়ের দিকে সরে গেলেন। সেই কঠিন সময়ে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা ছিল হামজা (রা.)-এর শাহাদাত। হামজা (রা.) ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা, বীর যোদ্ধা, "সাইয়্যিদুশ শুহাদা" — শহিদদের নেতা। তাঁকে হত্যা করেছিল ওয়াহশি নামের এক ক্রীতদাস, দূর থেকে বর্শা ছুঁড়ে।

সেদিন মুসলিম পক্ষে প্রায় সত্তর জন শহিদ হলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) — মদিনায় ইসলামের প্রথম দূত, যিনি পতাকা বহন করছিলেন। কুরাইশরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, কিন্তু তারা ময়দান ছেড়ে মক্কায় ফিরে গেল। মুসলিমরা মদিনায় ফিরলেন ভারাক্রান্ত হৃদয়ে, শহিদদের দাফন করলেন উহুদের প্রান্তরেই।

উহুদের শিক্ষা ছিল গভীর। একটি নির্দেশ অমান্য করার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে, তা সেদিন সবাই দেখলো। শৃঙ্খলা, ধৈর্য আর নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য — এই তিনটি জিনিস ছাড়া বিজয় ধরে রাখা যায় না। কুরআনে উহুদের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এসেছে, যেখানে মুসলিমদের সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে, ভুলগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, আর ভবিষ্যতের জন্য পথ দেখানো হয়েছে।

উহুদের পর মদিনা আরও সতর্ক হলো। শত্রুরা বুঝলো, মুসলিমদের হারানো সহজ নয় — কিন্তু মুসলিমরাও বুঝলো, জয়কে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এরপর শত্রুরা আরও বড় জোট গড়ে মদিনার দিকে আসবে — সেই জোটের মোকাবিলায় মদিনাকে খুঁড়তে হবে পরিখা।

উহুদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল বদরের পরাজয়ের ক্ষত থেকে। কুরাইশরা শুধু প্রতিশোধ চায়নি, তারা নিজেদের হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে চেয়েছিল। বর্ণনায় আছে, আবু সুফিয়ানের কাফেলার মুনাফা দিয়ে এই যুদ্ধের ব্যয় মেটানো হয়েছিল — অর্থাৎ বাণিজ্যের লাভ পরিণত হয়েছিল যুদ্ধের তহবিলে। বাহিনীতে ছিলেন প্রায় তিন হাজার যোদ্ধা, দুইশো ঘোড়া আর সাতশো বর্মধারী সৈন্য। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন নারীরা, যাঁরা ঢোল বাজিয়ে আর গান গেয়ে সৈন্যদের উৎসাহ দিতেন। কুরাইশ নেতৃত্বে ছিলেন আবু সুফিয়ান, আর অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ — যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি, কিন্তু যুদ্ধকৌশলে ইতিমধ্যেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। মদিনার দিকে তাঁদের যাত্রা ছিল ধীর ও সতর্ক, কারণ তাঁরা জানতেন, বদরের মতো আরেকটি পরাজয় তাঁদের প্রভাবকে চিরতরে ভেঙে দেবে।

মদিনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াটিও ছিল শিক্ষণীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিজের মত ছিল শহরের ভেতরে থেকে প্রতিরোধ করা — মদিনার অলিগলি আর ঘরবাড়ি শত্রুর জন্য সুবিধাজনক ময়দান হবে না। কিন্তু বহু তরুণ সাহাবি, বিশেষ করে যাঁরা বদরে অংশ নিতে পারেননি, তাঁরা খোলা ময়দানে গিয়ে যুদ্ধের পক্ষে মত দিলেন। তাঁদের আগ্রহ দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বর্ণনায় আছে, তিনি যুদ্ধের পোশাক পরে বের হলে কয়েকজন সাহাবি নিজেদের মত বদলাতে চাইলেন, কিন্তু তিনি বললেন, একজন নবি একবার বর্ম পরলে তা না খুলে যুদ্ধ না করে ফেরেন না। এই ঘটনায় দুটি শিক্ষা একসঙ্গে আছে — নেতা পরামর্শ শোনেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাতে অটল থাকেন। যাত্রাপথে অবশ্য একটি ধাক্কা এলো — প্রায় তিনশো জন সঙ্গী ফিরে গেলেন, ফলে মুসলিম বাহিনী দাঁড়ালো প্রায় সাতশো জনে।

যুদ্ধের ময়দানে উহুদ পাহাড়ের অবস্থান ছিল মুসলিম বাহিনীর জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা। পাহাড়কে পেছনে রেখে বাহিনী সাজানো হলো, আর পেছনের ফাঁকা পথটি পাহারা দেওয়ার জন্য পঞ্চাশ জন তিরন্দাজকে টিলার ওপর বসানো হলো। প্রথম পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী এগিয়ে গেল — কুরাইশ পদাতিকরা পিছু হটলো, তাঁদের শিবিরে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লো। কিন্তু টিলা ছাড়ার ভুলটি সব বদলে দিলো। খালিদ ইবনে ওয়ালিদের অশ্বারোহীরা খালি টিলার পাশ দিয়ে ঘুরে পেছন থেকে আঘাত হানলেন, আর সামনে থেকে ফিরে আসা কুরাইশরাও চাপ দিলো। দুই দিকের চাপে মুসলিম সারি ভেঙে গেল। গুজব ছড়ালো যে রাসুলুল্লাহ (সা.) শহিদ হয়েছেন, ফলে বিভ্রান্তি আরও বাড়লো। এই সংকটের মুহূর্তে কয়েকজন সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ঘিরে দাঁড়ালেন — তাঁদের মধ্যে ছিলেন তালহা (রা.), যিনি নিজের শরীর দিয়ে তাঁকে আঘাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন বলে বর্ণিত আছে।

যুদ্ধের পরের দিনগুলো ছিল আরও কঠিন পরীক্ষার। শহিদদের দাফন করা হলো উহুদের প্রান্তরেই — হামজা (রা.) ও মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-সহ প্রায় সত্তর জন শহিদকে সেখানেই সমাহিত করা হলো। বর্ণনায় আছে, মুসআব (রা.)-এর কাফনের কাপড় এতটাই ছোট ছিল যে, মাথা ঢাকলে পা বেরিয়ে যেত, আর পা ঢাকলে মাথা — এই দৃশ্য সেদিনের মুসলিম সমাজের ত্যাগের প্রতীক হয়ে রইলো। পরের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আহত শরীর নিয়েও হামরাউল আসাদ পর্যন্ত শত্রুর পিছু ধাওয়া করলেন, যাতে কুরাইশরা মনে না করে মুসলিমরা ভেঙে পড়েছে। এই পদক্ষেপ কাজে লাগলো — কুরাইশরা মদিনায় আর হামলা না করে মক্কায় ফিরে গেল। কুরআনের সূরা আলে ইমরানে উহুদের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এসেছে, যেখানে ভুল স্বীকার, ধৈর্যের উপদেশ আর ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা একসঙ্গে আছে। উহুদ তাই শুধু একটি পরাজয়ের গল্প নয় — এটি একটি সমাজের ভুল থেকে শিখে আবার দাঁড়ানোর গল্প।

*পরের পর্বে: খন্দকের যুদ্ধ (৬২৭) — পরিখার আড়ালে মহাজোটের পরাজয়।*

No comments:

Post a Comment

Search This Blog

Blog Archive