ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহার নাম শুনলে আজও আরবের মানুষের মনে এক অদ্ভুত ঘটনার ছবি ভেসে ওঠে। তিনি ছিলেন একজন ক্ষমতাশালী শাসক, যার হাতে ছিল বিশাল সেনাবাহিনী, আর সেই বাহিনীর সামনে চলতো হাতি — সে যুগের সবচেয়ে ভয়ংকর যুদ্ধযান। আরবের মরুভূমিতে হাতি ছিল বিরল দৃশ্য। তাই আবরাহার বাহিনী যখন মক্কার দিকে রওনা হলো, তখন গোটা আরব কেঁপে উঠলো।
ঘটনার সূত্রপাত ইয়েমেনে। আবরাহা সানায় একটি বিশাল গির্জা নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল, আরবের মানুষ যেন কাবার বদলে সেই গির্জার দিকে আসে, আর বাণিজ্য ও প্রভাব ইয়েমেনের দিকে ঘুরে যায়। কিন্তু আরবের মানুষের হৃদয় ছিল কাবার সঙ্গে বাঁধা। মক্কা ছিল শুধু একটি শহর নয় — সেটি ছিল আরবের ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র, যেখানে বছরে একবার হজের মৌসুমে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতো। আবরাহা বুঝলেন, কাবা যতদিন দাঁড়িয়ে আছে, তাঁর পরিকল্পনা সফল হবে না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন কাবা ধ্বংস করে দেবেন।
বাহিনী রওনা হলো। সামনে হাতি, পেছনে হাজার হাজার সৈন্য। পথে যারা বাধা দিতে এলো, তারা টিকতে পারলো না। মক্কার কাছাকাছি পৌঁছে আবরাহার বাহিনী কুরাইশদের উট ও সম্পদ লুট করে নিলো। মক্কার নেতা আবদুল মুত্তালিবের দুইশো উটও সেই লুটের মধ্যে ছিল।
আবরাহা দূত পাঠালেন মক্কায়। বার্তা ছিল স্পষ্ট — আমরা যুদ্ধ করতে আসিনি, আমরা শুধু কাবা ভাঙতে এসেছি। তোমরা সরে যাও, তোমাদের কোনো ক্ষতি হবে না। মক্কাবাসীর সামনে তখন দুটি পথ — অসম যুদ্ধে নেমে সব হারানো, কিংবা শহর ছেড়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেওয়া। আবদুল মুত্তালিব শহরবাসীকে পাহাড়ে সরে যেতে বললেন।
কিন্তু তার আগে তিনি নিজে আবরাহার সঙ্গে দেখা করতে গেলেন — নিজের উট ফেরত চাইতে। আবরাহা অবাক হলেন। এত বড় বিপদের মুখে এই বৃদ্ধ এসেছেন উটের কথা বলতে? আবদুল মুত্তালিবের জবাব ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তিনি বললেন, উটগুলো আমার, তাই আমি সেগুলো চাইছি। আর কাবার একজন মালিক আছেন — তিনিই তাঁর ঘর রক্ষা করবেন।
এরপর যা ঘটলো, তা কুরআনে সূরা আল-ফিলে বর্ণিত হয়েছে। বাহিনী যখন মক্কার দিকে এগোতে চাইলো, তখন হাতিগুলো বেঁকে বসলো। যেদিকে মক্কা, সেদিকে তারা এগোতে চাইলো না। আর ঠিক তখন আকাশে দেখা গেল ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। সেই পাখিগুলো ছোট ছোট পাথর বহন করে এনেছিল, আর সেগুলো বর্ষণ করলো বাহিনীর ওপর। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই বিশাল বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। আবরাহা নিজেও আহত অবস্থায় ইয়েমেনে ফিরে গেলেন বলে বর্ণিত আছে।
এই ঘটনা আরবের ইতিহাসে এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, সেই বছরটির নামই হয়ে গেল "হস্তীর বছর"। আর সেই বছরেই মক্কায় জন্ম নিলেন এক শিশু, যিনি পরবর্তীকালে হবেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কাবা রক্ষা পেল, আর সেই শিশুর জন্মের মধ্য দিয়ে আরবের ইতিহাস নতুন মোড় নিলো।
হস্তীবাহিনীর ঘটনা আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয় — ক্ষমতা আর অস্ত্রের দম্ভ যত বড়ই হোক, সত্যের ঘর রক্ষার দায়িত্ব যাঁর হাতে, তিনি কখনো অসহায় নন। আবরাহার হাতি মক্কায় ঢুকতে পারেনি, কিন্তু সেই বছরে জন্ম নেওয়া শিশুর বার্তা কয়েক দশকের মধ্যেই গোটা আরব ছাড়িয়ে বিশ্বের দরজায় পৌঁছে গিয়েছিল।
এই ঘটনার পেছনে ছিল ইয়েমেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক পটভূমি। সে সময় ইয়েমেন হাবশার প্রভাবের অধীনে ছিল, আর আবরাহা ছিলেন সেখানকার শক্তিশালী শাসক। সানা ছিল তাঁর রাজধানী — লোহিত সাগরের তীর ঘেঁষা বাণিজ্যপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দক্ষিণ আরবের বাণিজ্য, ধর্মীয় প্রভাব আর গোত্রগুলোর আনুগত্য — সবকিছু মিলিয়ে সানা তখন একটি বড় শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কিন্তু একটি জায়গা আবরাহার প্রভাবের বাইরে রয়ে গিয়েছিল, আর তা হলো মক্কা। কাবাকে কেন্দ্র করে মক্কা শুধু একটি উপাসনালয় ছিল না; সেটি ছিল আরব গোত্রগুলোর মিলনস্থল, বাণিজ্যিক মেলা আর শান্তিচুক্তির কেন্দ্র। হজের মৌসুমে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে মক্কায় জড়ো হতো, আর এই সমাগমই কুরাইশদের মর্যাদা ও বাণিজ্যের ভিত্তি ছিল। তাই কাবার মর্যাদা ভাঙা মানে ছিল মক্কার প্রভাব ভাঙা — আবরাহা সেই লক্ষ্যেই এগিয়েছিলেন বলে ইতিহাসবিদেরা মনে করেন।
মক্কার পথে আবরাহার বাহিনী বিনা বাধায় এগোয়নি। পথে কয়েকটি আরব গোত্র বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সুসজ্জিত বাহিনীর সামনে তারা টিকতে পারেনি। বর্ণনায় আছে, বাহিনীর সামনে থাকা বড় হাতিটির নাম ছিল মাহমুদ। আরবের মানুষ হাতিকে যুদ্ধের ময়দানে দেখতে অভ্যস্ত ছিল না, তাই এই দৃশ্যই ছিল এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ। মক্কার কাছাকাছি পৌঁছে বাহিনী মুঘাম্মাস নামের জায়গায় শিবির ফেললো। সেখান থেকে আবরাহা দূত পাঠালেন, আর তাঁর সৈন্যরা আশপাশের এলাকা থেকে উট ও গবাদি পশু নিয়ে এলো। মক্কাবাসী তখন বুঝে গিয়েছিল, সামনাসামনি যুদ্ধে এই বাহিনীর মোকাবিলা করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তাঁরা অস্ত্র হাতে শহর রক্ষার চেষ্টা না করে পাহাড়ের দিকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন — যাতে অন্তত মানুষের প্রাণ বাঁচে।
আবদুল মুত্তালিবের আবরাহার সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনাটি আরবের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি ছিলেন কুরাইশদের সম্মানিত নেতা, বয়সে প্রবীণ, কথায় ধীরস্থির। আবরাহার দরবারে গিয়ে তিনি নিজের উট ফেরত চাইলেন, কাবা রক্ষার জন্য কোনো অনুরোধ করলেন না। এই আচরণ প্রথমে আবরাহাকে বিস্মিত করেছিল, কারণ তিনি ভেবেছিলেন মক্কার নেতা হয়তো কাবার জন্য প্রাণভিক্ষা চাইতে এসেছেন। কিন্তু আবদুল মুত্তালিবের যুক্তি ছিল সরল ও গভীর — উট তাঁর নিজের সম্পদ, তাই তিনি তার দাবি করছেন; আর কাবার মালিক স্বয়ং আল্লাহ, তিনি নিজের ঘর রক্ষা করবেন। এই কথার মধ্যে ছিল এক ধরনের ভরসা, যা অস্ত্রের শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল না। আবরাহা উট ফেরত দিলেন বলে বর্ণিত আছে, কিন্তু কাবা ভাঙার সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে এলেন না।
ঘটনার পরিণতি আরবের মানুষের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। বাহিনী ধ্বংস হওয়ার পর মক্কার মর্যাদা আরও বেড়ে গেল। আরব গোত্রগুলো বুঝলো, কাবা কোনো সাধারণ ঘর নয় — এর সঙ্গে এমন এক শক্তির সম্পর্ক আছে, যা মানুষের হিসাবের বাইরে। সেই বছরটি এতটাই স্মরণীয় হয়ে রইলো যে, আরবরা এরপর বহু বছর ঘটনা দিয়ে সাল গুনতো — "হস্তীর বছর" হয়ে উঠলো সময় মাপার একটি পরিচিত চিহ্ন। আর সেই বছরেই মক্কায় জন্ম নিলেন মুহাম্মাদ (সা.), যাঁর আগমন আরবের ইতিহাসকে সম্পূর্ণ নতুন দিকে ঘুরিয়ে দেবে। কয়েক দশকের মধ্যে তাঁর বার্তা আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়লো। তাই হস্তীবাহিনীর গল্প শুধু একটি বাহিনীর পরাজয়ের গল্প নয় — এটি সেই মুহূর্তের গল্প, যখন একটি শহর রক্ষা পেল, আর সেই শহরেই জন্ম নিলেন এমন এক মানুষ, যিনি ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিলেন।
*পরের পর্বে: বদরের যুদ্ধ (৬২৪) — তিনশো তেরো জনের অসম লড়াই।*













No comments:
Post a Comment