শামের ময়দানে তখন উত্তেজনা চরমে। মুসলিম বাহিনী একের পর এক শহর জয় করে এগোচ্ছিল, আর রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস বুঝতে পারছিলেন — এই অগ্রযাত্রা না ঠেকালে শাম হাতছাড়া হবে। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের সব শক্তি একত্র করলেন। বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন থিওডোর — সম্রাটের ভাই — আর আর্মেনীয় সেনাপতি বাহান। তাঁদের বাহিনীর সংখ্যা নিয়ে বর্ণনায় মতভেদ আছে — কেউ বলেন এক লাখের বেশি, কেউ বলেন কম। তবে এটা নিশ্চিত যে, মুসলিম বাহিনীর চেয়ে তাঁরা সংখ্যায় অনেক বড় ছিলেন।
মুসলিম পক্ষে তখন নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়েছিল। আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের পর খলিফা হয়েছিলেন উমর (রা.)। তিনি খালিদ (রা.)-কে সেনাপতির পদ থেকে সরিয়ে আবু উবাইদা ইবনে জাররাহ (রা.)-কে প্রধান সেনাপতি করেছিলেন। কিন্তু আবু উবাইদা (রা.)-এর মহানুভবতা ছিল অসাধারণ — যুদ্ধের ময়দানে তিনি খালিদ (রা.)-কেই কৌশল নির্ধারণের দায়িত্ব দিলেন। ফলে বাহিনী পেল অভিজ্ঞ নেতা আর ঐক্যবদ্ধ কমান্ড।
দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো ইয়ারমুক নদীর কাছে — উঁচু পাহাড়, গভীর খাদ আর বাতাসের মুখোমুখি প্রান্তর। মুসলিম বাহিনীতে যোদ্ধা ছিলেন প্রায় ছত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আবু সুফিয়ান, আমর ইবনুল আস (রা.), ইকরিমা ইবনে আবু জাহল (রা.)-এর মতো অভিজ্ঞরা।
যুদ্ধ চললো কয়েক দিন। প্রথম দিনগুলোতে রোমানরা আক্রমণ করলো — বিশেষ করে তাঁদের অশ্বারোহী বাহিনী মুসলিমদের ডান দিক চেপে ধরলো। কিন্তু মুসলিমরা ধৈর্য ধরে রইলেন। খালিদ (রা.) তাঁর অশ্বারোহীদের রিজার্ভ হিসেবে রেখেছিলেন — ঠিক সময়ে আঘাত হানার জন্য।
নির্ণায়ক দিনে খালিদ (রা.) তাঁর পরিকল্পনা কার্যকর করলেন। তিনি রোমান বাহিনীর দুর্বল জায়গাগুলোতে একের পর এক আঘাত হানলেন, আর রোমানদের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন। রোমান বাহিনীর একটি বড় অংশ পিছু হটতে গিয়ে খাদের দিকে পড়ে গেল — সেতু ভেঙে যাওয়ায় তাঁদের পালানোর পথ বন্ধ হয়ে গেল। রোমান বাহিনী ভেঙে পড়লো। তাঁদের সেনাপতি বাহান নিহত হলেন বলে বর্ণনা আছে।
ইয়ারমুকের বিজয়ের পর শামের দরজা খুলে গেল। একের পর এক শহর মুসলিমদের হাতে এলো। হেরাক্লিয়াস শাম ছেড়ে কনস্টান্টিনোপলে ফিরে গেলেন — বলা হয়, তিনি শামকে বিদায় জানিয়ে বলেছিলেন, "বিদায়, হে সিরিয়া।" এই একটি যুদ্ধ শামের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল।
ইয়ারমুকের শিক্ষা ছিল — নেতৃত্বের পরিবর্তন বাহিনীকে দুর্বল করে না, যদি নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা থাকে। আবু উবাইদা (রা.) আর খালিদ (রা.)-এর সম্পর্ক সেই শিক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইয়ারমুকের আগে ও পরে শামের আরও অনেক শহরে লড়াই হয়েছিল। আর এই সিরিজের শেষ পর্বে থাকবে জালুলা ও তিকরিতের গল্প — ইরাক বিজয়ের সমাপ্তি।
ইয়ারমুকের আগে শামের পরিস্থিতি ছিল রোমান সাম্রাজ্যের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সম্রাট হেরাক্লিয়াস সবে পারস্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধ শেষ করে সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিলেন। সেই যুদ্ধে সাম্রাজ্যের অর্থ, সেনা ও প্রশাসন — সবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। শামের শহরগুলোতে রোমান কর ও প্রশাসনের প্রতি স্থানীয় মানুষের ক্ষোভও কম ছিল না। এদিকে মুসলিম বাহিনী শামের বিভিন্ন দিক থেকে এগোচ্ছিল — একদিকে আবু উবাইদা (রা.), অন্যদিকে আমর ইবনুল আস (রা.), ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) ও শুরাহবিল ইবনে হাসানা (রা.)। খালিদ (রা.)-এর পরামর্শ ছিল, বাহিনীগুলো আলাদা আলাদা না লড়ে এক জায়গায় একত্র হোক। সেই সিদ্ধান্তই ইয়ারমুকের ময়দানে সবাইকে একত্র করেছিল।
রোমান বাহিনী ছিল একটি জোটবাহিনী। এর মধ্যে ছিল বাইজেন্টাইন নিয়মিত সেনা, আর্মেনীয় যোদ্ধা এবং গাসসানি আরব মিত্ররা। বর্ণনা অনুযায়ী, বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়েও মতভেদ ছিল — সম্রাটের ভাই থিওডোর ও আর্মেনীয় সেনাপতি বাহান দুজনেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন। বিপরীতে মুসলিম বাহিনী ছোট হলেও সংগঠনে ছিল ঐক্যবদ্ধ। বাহিনী ডান, বাম ও কেন্দ্র — এই তিন ভাগে সাজানো হয়েছিল, আর খালিদ (রা.)-এর অধীনে রাখা হয়েছিল একটি চলমান অশ্বারোহী দল, যারা যেকোনো দিকে দ্রুত ছুটে গিয়ে দুর্বল জায়গা সামলাতে পারত। এই "চলমান রক্ষীবাহিনী" ইয়ারমুকের যুদ্ধে বারবার পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল।
যুদ্ধের প্রথম দিনগুলো ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। প্রথমে ছোট ছোট সংঘর্ষ ও একক যোদ্ধাদের লড়াই চলল, তারপর রোমানরা সংগঠিত আক্রমণ শুরু করল। বিশেষ করে রোমান অশ্বারোহীরা মুসলিমদের ডান দিকের ওপর চাপ সৃষ্টি করল। কোনো কোনো মুহূর্তে মুসলিম সারি পিছু হটতে বাধ্য হলো, এমনকি শিবিরের কাছাকাছি চলে এল। বর্ণনা অনুযায়ী, তখন শিবিরের নারীরা পিছু হটা যোদ্ধাদের সাহস জোগালেন এবং তাঁদের আবার ময়দানে ফিরতে উদ্বুদ্ধ করলেন। খালিদ (রা.) তাঁর অশ্বারোহী দল নিয়ে বারবার ভাঙা দিকগুলো জোড়া লাগালেন। এভাবে রোমান আক্রমণের জোয়ার আটকে গেল, কিন্তু কোনো পক্ষই তখনও নির্ণায়ক জয় পায়নি।
নির্ণায়ক দিনে পরিস্থিতি বদলে গেল। খালিদ (রা.) রোমান বাহিনীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা নিলেন। মুসলিম অশ্বারোহীরা রোমানদের বাম দিক ঘুরে পেছনে আঘাত হানল, আর পদাতিক বাহিনী সামনে থেকে চাপ ধরে রাখল। রোমান সারি ভাঙতে শুরু করল। পিছু হটার সময় তাঁদের সামনে পড়ল ইয়ারমুকের খাদ ও সরু পথ। বর্ণনা অনুযায়ী, সেতু ও সংকীর্ণ পথে ভিড় জমে যাওয়ায় বহু রোমান সৈন্য পালাতে পারল না। দিনের শেষে রোমান বাহিনী আর সংগঠিত শক্তি হিসেবে টিকে রইল না। বাইজেন্টাইন সেনাপতিরা নিহত হলেন বা পালিয়ে গেলেন, আর ময়দানের নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের হাতে এলো।
ইয়ারমুকের পর শামের চিত্র দ্রুত বদলে গেল। রোমান কেন্দ্রীয় বাহিনী আর শামে বড় আকারে প্রতিরোধ গড়তে পারল না। একের পর এক শহর সন্ধি করল বা আত্মসমর্পণ করল। স্থানীয় মানুষের অনেকেই দেখল, নতুন শাসনে তাঁদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে, আর করের বোঝা আগের চেয়ে হালকা। এই কারণে শামের বিজয় শুধু একটি ময়দানের জয় হয়ে রইল না, তা একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিল। ইয়ারমুকের বড় শিক্ষা ছিল নেতৃত্বের শালীনতা ও ঐক্য — পদ বদলালেও উদ্দেশ্য বদলায়নি, অভিজ্ঞতা ও বিনয় একসঙ্গে কাজ করলে ছোট বাহিনীও বড় জোটকে হারাতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে ধৈর্য ধরে সঠিক মুহূর্তের অপেক্ষা করা, সংরক্ষিত শক্তিকে অযথা খরচ না করা এবং ভূখণ্ডের সুবিধা বোঝা — এই তিনটি বিষয়ও ইয়ারমুকে স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল। এই কারণেই ইয়ারমুককে শুধু একটি যুদ্ধ নয়, শামের ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে মনে রাখা হয়।
*পরের পর্বে: জালুলা ও তিকরিতের যুদ্ধ (৬৩৭) — ইরাক বিজয়ের সমাপ্তি।*














No comments:
Post a Comment