Saturday, October 24, 2026

তাবুক অভিযান (৬৩০) — কষ্টের বাহিনীর দীর্ঘ যাত্রা

হিজরি নবম সন। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরম, খেজুর পাকার মৌসুম — মদিনায় তখন ফসল তোলার সময়। ঠিক সেই সময় খবর এলো — উত্তরে রোমান সাম্রাজ্য আরবের দিকে বড় বাহিনী পাঠাচ্ছে। খবরটি সত্যি ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। কিন্তু মদিনার নেতৃত্ব ঝুঁকি নিতে চাইলো না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা দিলেন — উত্তরে যাওয়া হবে।

এই অভিযান ছিল সবচেয়ে কঠিন। পথ ছিল প্রায় সাতশো কিলোমিটার, মরুভূমির মধ্য দিয়ে, প্রচণ্ড গরমে। খাদ্য ও পানির অভাব ছিল। বাহিনীর নামই হয়ে গেল "জাইশুল উসরা" — কষ্টের বাহিনী। কখনো কখনো দশজন যোদ্ধার জন্য একটি উট ছিল, পালা করে চড়তে হতো। পানি এত কম ছিল যে, উট জবাই করে তার পেটের পানি ব্যবহারের মতো কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছিল বলে বর্ণনা আছে।

এই কঠিন সময়ে মুসলিমদের দানশীলতা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। উসমান (রা.) একাই এত সম্পদ দান করলেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আজকের পর উসমানের কোনো কাজই তাঁর ক্ষতি করবে না। আবু বকর (রা.) নিজের ঘরের সব সম্পদ নিয়ে এলেন। উমর (রা.) অর্ধেক সম্পদ দান করলেন। নারীরাও গয়না দান করলেন।

বাহিনী তাবুকে পৌঁছলো — প্রায় ত্রিশ হাজার যোদ্ধা। কিন্তু রোমানদের কোনো বড় বাহিনীর দেখা মিললো না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে প্রায় বিশ দিন অবস্থান করলেন। এই সময়ে উত্তরের ছোট ছোট শহর ও গোত্র — আইলা, জারবা, আজরুহ — তাঁদের সঙ্গে সন্ধি করলো, আর জিজিয়া দিতে রাজি হলো। মদিনার প্রভাব উত্তরের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হলো, একটিও বড় যুদ্ধ ছাড়াই।

তবে তাবুকের গল্পে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়ও আছে। কয়েকজন মুসলিম এই অভিযানে অংশ নেননি — বিনা ওজরে পেছনে থেকে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন — কাব ইবনে মালিক (রা.), মুরারা ইবনে রাবি (রা.) ও হিলাল ইবনে উমাইয়া (রা.) — পরে তওবা করেছিলেন। তাঁদের তওবা কবুলের ঘটনা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, আর এটি মুসলিমদের জন্য তওবা ও সত্য বলার এক চিরন্তন শিক্ষা হয়ে আছে।

তাবুক থেকে ফিরে মদিনা আরও শক্তিশালী হলো। আরব উপদ্বীপের প্রায় সব গোত্র তখন মদিনার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ইতিহাসের চাকা থামে না। হিজরি একাদশ সনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করলেন। তাঁর পর খলিফা হলেন আবু বকর (রা.)। আর তাঁর সামনে দাঁড়ালো নতুন সংকট — কিছু গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করলো, কেউ কেউ মিথ্যা নবুওয়তের দাবি তুললো। সেই সংকটের মোকাবিলায় শুরু হলো রিদ্দার যুদ্ধ।

তাবুক অভিযানের পেছনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বোঝা খুব জরুরি। এর ঠিক আগের বছর মু'তার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী রোমানদের মুখোমুখি হয়েছিল। সেই যুদ্ধে তিনজন সেনাপতি একে একে শহিদ হয়েছিলেন, তবু বাহিনী সুশৃঙ্খলভাবে ফিরে এসেছিল। এরপর আরবের উত্তর সীমান্তে রোমান প্রভাব বাড়তে থাকল। গাসসানিদের মতো আরব মিত্র গোত্রগুলো রোমানদের পক্ষে ছিল। এমন সময় খবর ছড়াল, রোমান সম্রাটের বাহিনী বলকা অঞ্চলে জড়ো হচ্ছে, আর আরবের দিকে এগোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। খবরটি কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে আজও মতভেদ আছে। কিন্তু মদিনার নেতৃত্বের দৃষ্টিতে বিষয়টি ছিল সোজা: উত্তর সীমান্তে যদি রোমানরা এসে আরব গোত্রগুলোকে নিজেদের পক্ষে টেনে নেয়, তাহলে মদিনার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। তাই অপেক্ষা না করে নিজেই উত্তর দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। এটি ছিল প্রতিরোধের যাত্রা, আক্রমণের চেয়ে অনেক বেশি সতর্কতার বার্তা।

এই অভিযানকে কেন "কষ্টের বাহিনী" বলা হয়, সেটা পথের বিবরণ পড়লেই বোঝা যায়। সময়টা ছিল প্রচণ্ড গ্রীষ্ম। খেজুর পাকার মৌসুমে মানুষ সাধারণত ঘরে থাকে, ফসল তোলে, আর ছায়ায় বিশ্রাম নেয়। অথচ সেই সময়েই প্রায় সাতশো কিলোমিটার মরুপথ পাড়ি দিতে হলো। খাদ্য কম ছিল, পানি আরও কম ছিল। বর্ণনামতে, কখনো কখনো দশজন যোদ্ধার ভাগে একটি উট পড়ত, আর তাঁরা পালা করে সেই উটে চড়তেন। কখনো খেজুর আর পানি এত কমে যেত যে, যাত্রা চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ত। এই সময়ে মুনাফিকরা নানা অজুহাত দেখিয়ে পেছনে থেকে গেল, আর অন্যদেরও নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করল। তারা বলল, এই গরমে যাওয়া ঠিক হবে না।

এই অভিযানের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় হলো দানশীলতার প্রতিযোগিতা। উসমান (রা.) একাই এত বড় অঙ্কের সম্পদ দিলেন যে, বর্ণনামতে তাঁর দানের মধ্যে ছিল প্রায় এক হাজার দিনার আর তিনশোটির মতো সাজানো উট। আবু বকর (রা.) নিজের ঘরের সব সম্পদ নিয়ে এলেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, পরিবারের জন্য কী রেখে এলেন, তখন তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে রেখে এলাম — এই মর্মের জবাব বর্ণনায় এসেছে। উমর (রা.) নিজের সম্পদের অর্ধেক দান করলেন, আর ভেবেছিলেন, এবার অন্তত তিনি আবু বকর (রা.)-কে ছাড়িয়ে যাবেন। কিন্তু আবু বকর (রা.)-এর ত্যাগ দেখে তিনি বুঝলেন, ভালোবাসার প্রতিযোগিতায় কেউ কাউকে সহজে ছাড়িয়ে যেতে পারে না। আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-সহ আরও অনেক ধনী সাহাবি বড় বড় দান করলেন। সাধারণ মানুষও পিছিয়ে থাকলেন না। নারীরা গয়না খুলে দিলেন। যাঁদের কিছুই ছিল না, তাঁরা শ্রম দিয়ে সাহায্য করলেন।

পথের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় হলো হিজর এলাকা পার হওয়ার ঘটনা। হিজর ছিল সামুদ জাতির পুরনো আবাস। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে পৌঁছে সাহাবিদের সতর্ক করলেন। তিনি তাঁদের বললেন, আজাবপ্রাপ্ত জাতির এলাকায় কান্না ছাড়া প্রবেশ কোরো না, আর সেখানকার পানি ব্যবহার কোরো না। শুধু সেই কূপের পানি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলো, যেখান থেকে সামুদ জাতির উট পানি খেত বলে পরিচিত ছিল। বর্ণনামতে, যাত্রাপথে একসময় পানির সংকট এত বেড়ে গেল যে, সাহাবিরা খুব কষ্টে পড়লেন। এরপর বৃষ্টি এলো, আর সবাই স্বস্তি পেলেন। এসব ঘটনা বাহিনীর মনে একটি গভীর অনুভূতি তৈরি করল: এই যাত্রা শুধু সামরিক অভিযান নয়, এটি একটি আত্মিক পরীক্ষাও। পুরনো জাতির ধ্বংসাবশেষের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া তাঁদের মনে করিয়ে দিল, শক্তি আর সম্পদ কাউকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখে না, বাঁচিয়ে রাখে সত্যের ওপর অবিচল থাকা।

তাবুকে পৌঁছে বাহিনী প্রায় বিশ দিন অবস্থান করল। বড় কোনো রোমান বাহিনীর দেখা মিলল না। কিন্তু এই অবস্থান মোটেও ব্যর্থ ছিল না। বরং এটাই ছিল অভিযানের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। উত্তরের ছোট শহর আর গোত্রগুলো বুঝে গেল, মদিনা এখন এত দূর পর্যন্ত নিজের শক্তি পৌঁছে দিতে পারে। আইলার শাসক ইউহান্না ইবনে রুবা এসে সন্ধি করলেন। জারবা আর আজরুহের মানুষও সন্ধিতে এলো। এছাড়া খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি দল দুমাতুল জান্দালে গিয়ে সেখানকার শাসক উকাইদিরকে বন্দি করে আনল, আর সেই অঞ্চলও সন্ধির আওতায় এলো। এসব সন্ধির মাধ্যমে মদিনার প্রভাব উত্তরের বাণিজ্য পথ পর্যন্ত বিস্তৃত হলো, একটিও বড় যুদ্ধ ছাড়াই।

তাবুকের শিক্ষা অবশ্য শুধু কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। মদিনায় ফিরে আসার পর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা ছিল সত্য বলার পরীক্ষা। যাঁরা বিনা ওজরে পেছনে থেকে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনজন — কাব ইবনে মালিক (রা.), মুরারা ইবনে রাবি (রা.) ও হিলাল ইবনে উমাইয়া (রা.) — কোনো মিথ্যা অজুহাত দিলেন না। তাঁরা সত্যি কথা বললেন যে, তাঁদের কোনো বৈধ ওজর ছিল না। এরপর তাঁদের সঙ্গে প্রায় পঞ্চাশ দিন সামাজিক বয়কট চলল। কেউ তাঁদের সঙ্গে কথা বলত না, এমনকি পরিবারের মানুষও দূরে থাকত। সেই পঞ্চাশ দিন ছিল তাঁদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন। কিন্তু তাঁরা ধৈর্য ধরলেন, তওবা করলেন, আর শেষ পর্যন্ত তাঁদের তওবা কবুলের ঘোষণা এলো। কুরআনে এই ঘটনার উল্লেখ আছে, আর এটি মুসলিমদের শিখিয়ে গেল — ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়, বরং সত্যের প্রতি সবচেয়ে বড় সাহস। তাবুক তাই শুধু একটি অভিযানের নাম নয়, এটি কষ্টের মধ্যে দান, সত্যের মধ্যে তওবা, আর যুদ্ধ ছাড়াই শক্তি প্রদর্শনের এক অনন্য ইতিহাস।

*পরের পর্বে: রিদ্দার যুদ্ধ (৬৩২) — ভাঙনের মুখে আরবের ঐক্য রক্ষা।*

No comments:

Post a Comment

Search This Blog

Blog Archive