Saturday, October 24, 2026

খন্দকের যুদ্ধ (৬২৭) — পরিখার আড়ালে মহাজোটের পরাজয়

উহুদের পর দুই বছর কেটে গেল। কুরাইশরা বুঝেছিল, একা মদিনাকে হারানো যাবে না। তাই তারা গোটা আরবের গোত্রগুলোকে একত্র করলো — কুরাইশ, গাতফান, সুলাইম, আসাদসহ আরও অনেক গোত্র। এই জোটের সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার — আরবের ইতিহাসে এত বড় জোট এর আগে দেখা যায়নি। তাই এই যুদ্ধের আরেক নাম "গাযওয়াতুল আহযাব" — জোটগুলোর যুদ্ধ। হিজরি পঞ্চম সনে এই মহাজোট মদিনার দিকে রওনা হলো।

মদিনায় খবর পৌঁছতেই চিন্তার ছায়া নেমে এলো। মুসলিম বাহিনীতে যোদ্ধা ছিলেন প্রায় তিন হাজার। খোলা ময়দানে দশ হাজারের মুখোমুখি হওয়া ছিল আত্মঘাতী। তখন সালমান ফারসি (রা.) একটি পরামর্শ দিলেন, যা আরবে তখনও প্রচলিত ছিল না। তিনি ছিলেন পারস্যের মানুষ, আর পারস্যে শহর রক্ষার জন্য পরিখা খোঁড়ার রীতি ছিল। তাঁর প্রস্তাব ছিল — মদিনার যে দিকটি খোলা, সেদিকে একটি গভীর ও চওড়া পরিখা খোঁড়া হোক, যাতে শত্রুর ঘোড়া ও সৈন্য পার হতে না পারে।

প্রস্তাব গৃহীত হলো। মুসলিমরা দিনরাত পরিশ্রম করে পরিখা খুঁড়লেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও সেই কাজে অংশ নিলেন — মাটি বইলেন, পাথর ভাঙলেন। সেই সময়ের একটি বিখ্যাত ঘটনা আছে — একটি শক্ত পাথর ভাঙতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আঘাতে আগুনের ফুলকি ছুটলো, আর তিনি ভবিষ্যতের বিজয়ের সুসংবাদ দিলেন। ক্ষুধা আর কষ্টের মধ্যেও সাহাবিদের মনোবল ভাঙেনি।

জোট বাহিনী এসে দেখলো সামনে পরিখা। তারা হতভম্ব হয়ে গেল। আরবে এর আগে কেউ এমন কৌশল দেখেনি। তারা পরিখার ওপারে শিবির স্থাপন করলো। দিনের পর দিন চেষ্টা করলো পার হওয়ার — কয়েকজন সাহসী যোদ্ধা ঘোড়া নিয়ে পরিখা পার হওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু মুসলিম তিরন্দাজরা তাদের ঠেকিয়ে দিলো। বিখ্যাত যোদ্ধা আমর ইবনে আবদে উদের মতো কয়েকজন পার হতে পারলেও তাঁরা আলি (রা.)-এর হাতে নিহত হলেন।

এদিকে অবরোধ দীর্ঘ হতে লাগলো। শীতের রাত, খাদ্যের অভাব, আর ঘোড়াগুলোর কষ্ট — জোটের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে লাগলো। তার ওপর মদিনার ভেতরের ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজার সঙ্গে জোটের গোপন যোগাযোগের চেষ্টা নস্যাৎ হয়ে গেল। নুআইম ইবনে মাসউদ (রা.) নামের এক ব্যক্তি কৌশলে জোটের গোত্রগুলোর মধ্যে সন্দেহ ছড়িয়ে দিলেন — প্রত্যেক পক্ষ ভাবতে লাগলো, অন্যরা তাদের ছেড়ে চলে যাবে।

শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি নিজেই যুদ্ধের ফয়সালা করলো। এক রাতে প্রচণ্ড ঝড় উঠলো — তাঁবু উপড়ে গেল, আগুন নিভে গেল, জোটের শিবিরে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো। আবু সুফিয়ান বুঝলেন, আর থাকা যাবে না। তিনি ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সকালে মুসলিমরা দেখলো, পরিখার ওপারে কেউ নেই। মহাজোট ভেঙে গেছে, একটিও বড় যুদ্ধ ছাড়াই।

খন্দকের বিজয় ছিল কৌশল, ধৈর্য আর ঐক্যের বিজয়। মদিনা প্রমাণ করলো, সংখ্যা আর অস্ত্রই সব নয় — বুদ্ধি আর মনোবলও যুদ্ধের বড় অস্ত্র। এই যুদ্ধের পর কুরাইশদের মদিনা আক্রমণের সাহস আর ফিরে আসেনি। বরং এর দুই বছরের মধ্যেই হুদাইবিয়ার সন্ধি হলো, আর তার দুই বছর পর মক্কা বিজয় হলো।

কিন্তু মদিনার সীমান্তের বাইরেও তখন শক্তি বাড়ছিল। উত্তরে রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব, আর দক্ষিণে আরবের গোত্রগুলো — সবাই মদিনার দিকে তাকিয়ে ছিল। এর মধ্যেই একদিন মদিনা থেকে একটি ছোট বাহিনী উত্তরের দিকে রওনা হলো — গন্তব্য মুতার প্রান্তর।

এই মহাজোট গড়ে ওঠার পেছনে একটি পুরোনো ক্ষোভ কাজ করছিল। মদিনা থেকে বিতাড়িত বনু নদির গোত্রের নেতারা মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের উসকে দিয়েছিলেন, তারপর গাতফানসহ অন্যান্য গোত্রের কাছে গিয়ে একই কথা বলেছিলেন — সবাই মিলে একসঙ্গে আঘাত করলে মদিনা আর টিকতে পারবে না। তাদের যুক্তি ছিল সরল: মুসলিমরা বদরে ও উহুদে টিকে গেছে বটে, কিন্তু গোটা আরব এক হলে সেই শক্তি ভেঙে পড়বে। এভাবেই ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পুরোনো শত্রুতা আর ক্ষমতার ভয় মিলে এক বিশাল জোটের জন্ম দিল, যার লক্ষ্য ছিল একটাই — মদিনাকে চিরতরে শেষ করে দেওয়া।

মদিনার ভূগোল অবশ্য প্রতিরক্ষার কাজে কিছুটা সাহায্য করেছিল। শহরের পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ছিল পাথুরে আগ্নেয়ভূমি, যেখানে ঘোড়া নিয়ে দ্রুত এগোনো কঠিন ছিল, আর দক্ষিণ দিকে ছিল খেজুরবাগান ও ঘনবসতি। খোলা ছিল মূলত উত্তর দিক। তাই পরিখা খোঁড়া হলো ঠিক সেই দিকেই। কাজটি ছিল অত্যন্ত কঠিন — শক্ত মাটি, পাথর, শীতের ঠান্ডা, আর খাদ্যের অভাব। বর্ণনায় এসেছে, ক্ষুধার কষ্টে অনেক সাহাবি পেটে পাথর বেঁধে কাজ করছিলেন। তবু মুহাজির ও আনসাররা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ চালিয়ে গেলেন, আর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে তাঁদের মাঝে থেকে মাটি বহন করলেন। এই দৃশ্যই বলে দেয়, নেতৃত্ব সেদিন দূর থেকে নির্দেশ দেয়নি — নেতা নিজে মাঠে নেমেছিলেন।

অবরোধের দিনগুলো ছিল মানসিক চাপের চরম পরীক্ষা। দিনের বেলা পরিখার দুই পাশ থেকে তির ছোড়াছুড়ি চলতো, রাতে পাহারা দিতে হতো সতর্ক হয়ে। শহরের ভেতরে নারী ও শিশুদের রাখা হয়েছিল সুরক্ষিত দুর্গে, আর পুরুষরা সারারাত পালা করে পরিখা পাহারা দিতেন। খাদ্য কমে আসছিল, শীত বাড়ছিল, আর ভেতরে ভেতরে একটি ভয়ও কাজ করছিল — বনু কুরাইজা যদি সত্যিই জোটের সঙ্গে হাত মেলায়, তাহলে মদিনা দুই দিক থেকে ঘেরাও হয়ে যাবে। এই সংকটের মুহূর্তে ধৈর্য ধরে রাখা, গুজবে কান না দেওয়া, আর পরিখা ছেড়ে না যাওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় কৌশল। যুদ্ধ অনেক সময় অস্ত্র দিয়ে নয়, অপেক্ষা দিয়েও জেতা যায় — খন্দক তার প্রমাণ।

জোট ভেঙে যাওয়ার পর ঘটনা এখানেই থামেনি। জোটের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগের অভিযোগে বনু কুরাইজাকে অবরোধ করা হলো, আর দীর্ঘ অবরোধের পর তারা আত্মসমর্পণ করলো। তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলেন সাদ ইবনে মুআজ (রা.), যিনি অবরোধের সময় আহত হয়েছিলেন। এই ঘটনার পর মদিনার রাজনৈতিক চিত্র পুরোপুরি বদলে গেল। কুরাইশরা আর কখনো মদিনা আক্রমণ করতে আসেনি — আক্রমণের যুগ শেষ হয়ে প্রতিরক্ষা থেকে অগ্রসর হওয়ার যুগ শুরু হলো। খন্দকের শিক্ষা তাই আজও প্রাসঙ্গিক: সংকটে পরামর্শ নেওয়া, নতুন কৌশল গ্রহণে দ্বিধা না করা, নেতার নিজে মাঠে থাকা, আর বিপদের সময় ঐক্য ধরে রাখা — এই চারটি গুণই একটি ছোট শক্তিকে বিশাল জোটের সামনে টিকিয়ে রেখেছিল।

*পরের পর্বে: মুতার যুদ্ধ (৬২৯) — তিন সেনাপতির শাহাদাতের ময়দান।*

No comments:

Post a Comment

Search This Blog

Blog Archive