হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়েছিল হিজরি ষষ্ঠ সনে। সন্ধির শর্ত ছিল — দশ বছর যুদ্ধ বন্ধ থাকবে, আর যে গোত্র চাইবে, সে মুসলিমদের সঙ্গে বা কুরাইশদের সঙ্গে মিত্রতা করতে পারবে। খুজাআ গোত্র মুসলিমদের মিত্র হলো, আর বকর গোত্র কুরাইশদের। কিন্তু দুই বছর পর বকর গোত্র রাতের অন্ধকারে খুজাআদের ওপর আক্রমণ করলো, আর কুরাইশরা গোপনে তাদের সাহায্য করলো। সন্ধি ভেঙে গেল।
খুজাআদের একটি প্রতিনিধি দল মদিনায় এসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সব জানালো। কুরাইশরা বুঝতে পারলো, ভুল হয়ে গেছে — তারা ক্ষমা চাইতে আবু সুফিয়ানকে মদিনায় পাঠালো। কিন্তু তখন আর সন্ধি নবায়নের সুযোগ ছিল না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে প্রস্তুতি নিলেন। হিজরি অষ্টম সনের রমজান মাসে প্রায় দশ হাজার যোদ্ধা নিয়ে মুসলিম বাহিনী মক্কার দিকে রওনা হলো। এত বড় বাহিনী আরব এর আগে দেখেনি।
মক্কার কাছে পৌঁছে বাহিনী চারদিক থেকে শহরে প্রবেশের পরিকল্পনা করলো। নির্দেশ ছিল পরিষ্কার — কেউ বাধা না দিলে কেউ অস্ত্র চালাবে না। আবু সুফিয়ান ততক্ষণে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মক্কায় ফিরে মানুষকে বললেন, প্রতিরোধ করা বৃথা। বেশিরভাগ মানুষ ঘরে দরজা বন্ধ করে রইলো। মাত্র দুটি জায়গায় ছোটখাটো সংঘর্ষ হলো, কিন্তু সামগ্রিকভাবে মক্কা প্রায় রক্তপাত ছাড়াই বিজিত হলো।
এরপরের ঘটনা ইতিহাসের সবচেয়ে মহান ক্ষমার দৃষ্টান্তগুলোর একটি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবায় প্রবেশ করলেন। ভেতরে ও চারপাশে ছিল তিনশো ষাটটি মূর্তি। তিনি একে একে সেগুলো সরিয়ে দিলেন, আর পাঠ করলেন — "সত্য এসেছে, মিথ্যা দূর হয়েছে।" তারপর তিনি কাবার দরজায় দাঁড়িয়ে মক্কাবাসীর উদ্দেশে বললেন, আজ তোমাদের ওপর কোনো প্রতিশোধ নেই। যারা নিজের ঘরে থাকবে, তারা নিরাপদ। যারা আবু সুফিয়ানের ঘরে যাবে, তারা নিরাপদ। যারা মসজিদে প্রবেশ করবে, তারা নিরাপদ।
যারা একদিন তাঁকে মক্কা ছাড়তে বাধ্য করেছিল, তাঁর সাহাবিদের ওপর অত্যাচার করেছিল, হামজা (রা.)-এর মতো প্রিয়জনকে হত্যা করেছিল — সেই মানুষগুলোই আজ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আর তিনি ঘোষণা করলেন সাধারণ ক্ষমা। শুধু কয়েকজন অপরাধীকে এর আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, যাদের অপরাধ ছিল সীমা ছাড়ানো।
সেদিন বিলাল (রা.) কাবার ছাদে উঠে আজান দিলেন। একদিন যাঁকে মক্কার রোদে পাথর চাপা দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল, সেদিন তাঁর কণ্ঠেই মক্কার আকাশে ধ্বনিত হলো আল্লাহর নাম। মক্কার মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে লাগলো।
মক্কা বিজয় শুধু একটি শহর দখল ছিল না — এটি ছিল আরবের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা। এরপর আরবের গোত্রগুলো দলে দলে মদিনার দিকে আসতে লাগলো। আরব উপদ্বীপের ঐক্যের পথ খুলে গেল।
কিন্তু বিজয়ের আনন্দ বেশিদিন টিকলো না। মক্কা বিজয়ের পরপরই খবর এলো — হাওয়াজিন ও সাকিফ গোত্রের বিশাল বাহিনী মুসলিমদের বিরুদ্ধে জড়ো হচ্ছে। বিজয়ী বাহিনীকে আবার যুদ্ধের ময়দানে নামতে হলো — এবার হুনাইনের উপত্যকায়।
হুদাইবিয়ার সন্ধি ভাঙার ঘটনাটি বোঝতে হলে পুরোনো গোত্রীয় শত্রুতার কথা মনে রাখতে হয়। খুজাআ ও বকর গোত্রের মধ্যে বহু আগের বিরোধ ছিল। সন্ধির পর খুজাআ মুসলিমদের মিত্র হলো, বকর কুরাইশদের। কিন্তু পুরোনো প্রতিশোধের আগুন নিভে যায়নি। বকর গোত্র রাতের আঁধারে খুজাআদের ওপর হামলা চালালো, আর কুরাইশদের একাংশ গোপনে অস্ত্র ও লোক দিয়ে তাদের সাহায্য করলো। এভাবে একটি গোত্রীয় সংঘর্ষ সন্ধির শর্ত ভঙ্গের ঘটনায় পরিণত হলো। কুরাইশরা পরে নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেও তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল — সন্ধি ভঙ্গের দায় তাদের কাঁধেই বর্তেছিল।
মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) চেয়েছিলেন শহরে যেন অযথা রক্তপাত না হয়, তাই বাহিনীর গন্তব্য গোপন রাখা হলো, এমনকি মদিনার ভেতরের অনেকেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানতেন না কোথায় যাওয়া হচ্ছে। রমজান মাসে রওনা হওয়ার পর পথে বাহিনীতে আরও গোত্র যোগ দিল, ফলে সংখ্যা বেড়ে প্রায় দশ হাজারে পৌঁছালো। মক্কার কাছে মাররুজ জাহরান নামের স্থানে বাহিনী শিবির স্থাপন করলে রাতের বেলা হাজারো আগুনের আলো দূর থেকে দেখা গেল। আবু সুফিয়ান তখন মক্কার পরিস্থিতি দেখতে এসে সেই দৃশ্য দেখে বুঝলেন, প্রতিরোধের কোনো অর্থ নেই। সেখানেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন, আর মক্কায় ফিরে মানুষকে অস্ত্র না তোলার আহ্বান জানান।
মক্কায় প্রবেশের পরিকল্পনাও ছিল শান্তির বার্তায় ভরা। বাহিনী একাধিক দিক থেকে শহরে প্রবেশ করলো, কিন্তু প্রতিটি দলের প্রতি নির্দেশ ছিল একই — যে অস্ত্র তুলবে না, তাকে আঘাত করা যাবে না। নারী, শিশু ও নিরস্ত্র মানুষের নিরাপত্তা ঘোষণা করা হলো, আর কাবার চাবি রক্ষার দায়িত্বে থাকা পরিবারের কাছ থেকে চাবি নিয়ে পরে আবার তাঁদের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া হলো। এই ছোট কাজটি বড় বার্তা দিয়েছিল: বিজয় মানে পুরোনো সবকিছু মুছে ফেলা নয়, বরং ন্যায়ের ভিত্তিতে নতুন ব্যবস্থা গড়া। কাবা থেকে মূর্তি সরিয়ে দেওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সেখানে নামাজ আদায় করলেন, আর বিলাল (রা.)-এর আজান ঘোষণা করলো — এই শহর এখন তাওহিদের শহর।
সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা মক্কাবাসীর জন্য ছিল অবিশ্বাস্য। যাঁরা বছরের পর বছর মুসলিমদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিলেন, তাঁরাই সেদিন ক্ষমা পেলেন। শুধু অল্প কয়েকজন, যাদের অপরাধ ছিল ব্যতিক্রমী ও সীমা ছাড়ানো, এই ক্ষমার বাইরে ছিলেন। এমনকি তাঁদের অনেকেও পরে ক্ষমা চেয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর আরবের গোত্রগুলো দলে দলে মদিনায় প্রতিনিধি পাঠাতে লাগলো — ইতিহাসে এই বছরটি "প্রতিনিধি দলের বছর" নামে পরিচিত। মক্কা বিজয়ের শিক্ষা তাই যুদ্ধের কৌশলের চেয়ে অনেক বড়: প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা বেছে নেওয়া, বিজয়ের মুহূর্তে অহংকার না করা, আর পরাজিত মানুষকে সম্মান দিয়ে নিজের পক্ষে আনা — এই গুণগুলোই একটি শহর জয়কে একটি সভ্যতার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় পরিণত করেছিল।
বিজয়ের পরদিনগুলোতে মক্কার জীবন দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে উঠলো। বাজার খুললো, মানুষ নিজ নিজ কাজে ফিরলো, আর কাবাকে কেন্দ্র করে নতুন ধর্মীয় জীবন গড়ে উঠলো। যাঁরা একদিন মুসলিমদের শহর থেকে বের করে দিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন মসজিদে এসে নামাজে দাঁড়ালেন, আর মুহাজিরদের পুরোনো ঘরবাড়ি ও সম্পত্তির প্রশ্নে কোনো প্রতিশোধমূলক দখলদারি চালানো হলো না। এই সংযমই মক্কাবাসীর আস্থা অর্জন করেছিল, কারণ তাঁরা দেখলেন — বিজয়ীরা শহর লুট করতে আসেনি, এসেছে একটি ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে। আর সেই আস্থা থেকেই আরবের গোত্রগুলোর দলে দলে ইসলাম গ্রহণের পথ খুলে গেল।
*পরের পর্বে: হুনাইনের যুদ্ধ (৬৩০) — উপত্যকার অতর্কিত আক্রমণ আর ঘুরে দাঁড়ানো।*













No comments:
Post a Comment