ইরাকের ময়দানে তখন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছিল। খালিদ (রা.) শামের দিকে চলে যাওয়ার পর ইরাকের দায়িত্বে ছিলেন অন্য সেনাপতিরা। সাসানিদরা আবার শক্তি জড়ো করছিল। ফোরাত নদীর তীরে, কুস নাতিফের কাছে, দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো। এই যুদ্ধ ইতিহাসে "সেতুর যুদ্ধ" নামে পরিচিত — কারণ যুদ্ধ হয়েছিল নদীর ওপর তৈরি একটি সেতুর কাছে।
মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন আবু উবাইদ আস-সাকাফি। তাঁর বাহিনীতে যোদ্ধা ছিলেন প্রায় নয় হাজার। অন্যদিকে সাসানিদ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন বাহমান জাদুইয়া। তাঁদের বড় অস্ত্র ছিল হাতি — যুদ্ধের হাতি, যাদের পিঠে ছিল হাওদা, আর গলায় ঘণ্টা। আরবের ঘোড়া এর আগে কখনো হাতির মুখোমুখি হয়নি। ঘোড়াগুলো হাতির গর্জন আর গন্ধে ভয় পেয়ে ছুটোছুটি করতে লাগলো।
আবু উবাইদ নিজে নেমে পড়লেন হাতির মোকাবিলায়। তিনি একটি হাতির পা কেটে ফেললেন বলে বর্ণনা আছে, কিন্তু সেই হাতিটিই পড়ে গিয়ে তাঁকে পিষে ফেললো। সেনাপতির মৃত্যুতে বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলো। কেউ কেউ সেতুর দিকে পালাতে লাগলো। আর ঠিক তখন সেতু ভেঙে যাওয়া বা কেটে দেওয়ার ঘটনা ঘটলো — পালানোর পথ বন্ধ হয়ে গেল। বহু যোদ্ধা নদীতে ডুবে গেলেন, অনেকে নিহত হলেন।
এই পরাজয় ছিল মুসলিমদের জন্য বড় আঘাত। কিন্তু বাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি। মুসান্না ইবনে হারিসা — যিনি আবু উবাইদের পর দায়িত্ব নিয়েছিলেন — বাকি সৈন্যদের নিয়ে পিছু হটলেন, আর নতুন করে সংগঠিত হলেন। তিনি মদিনায় খবর পাঠালেন, সাহায্য চাইলেন। খলিফা উমর (রা.) নতুন বাহিনী পাঠালেন।
সেতুর যুদ্ধের শিক্ষা ছিল কঠিন কিন্তু মূল্যবান। প্রথমত, অপরিচিত অস্ত্রের মুখোমুখি হওয়ার আগে প্রস্তুতি দরকার — হাতির বিরুদ্ধে ঘোড়া নয়, পদাতিক কৌশল দরকার। দ্বিতীয়ত, পিছু হটার পথ নিজের হাতে ধ্বংস করা কখনো উচিত নয়। তৃতীয়ত, একজন সেনাপতির মৃত্যু বাহিনীর শেষ নয় — নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা থাকতে হয়।
এরপরের বছরগুলোতে মুসলিমরা এই শিক্ষা কাজে লাগালেন। কাদিসিয়ার যুদ্ধে হাতির মোকাবিলায় তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল নিলেন — আর সেই যুদ্ধেই পারস্য সাম্রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারিত হলো। কিন্তু তার আগে শামের ময়দানে আরও লড়াই বাকি ছিল — মারজুর রুমের প্রান্তরে, যেখানে রোমানদের আরেকটি বাহিনী অপেক্ষা করছিল।
সেতুর যুদ্ধের পটভূমি বুঝতে হলে ইরাকের পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হয়। খালিদ (রা.) ইরাক থেকে শামের দিকে চলে যাওয়ার পর সেখানে মুসলিম বাহিনী অপেক্ষাকৃত ছোট হয়ে গিয়েছিল। সাসানিদ সাম্রাজ্য তখন নিজেদের ভেতরের অস্থিরতা কাটিয়ে আবার সংগঠিত হচ্ছিল। তাঁদের সেনাপতি রুস্তম নতুন করে বাহিনী গোছাচ্ছিলেন, আর সীমান্তে চাপ বাড়ছিল। খলিফা উমর (রা.) এই অবস্থায় আবু উবাইদ আস-সাকাফিকে ইরাকের সেনাপতি করে পাঠালেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মুসান্না ইবনে হারিসা, যিনি ইরাকের ময়দান ভালোভাবে চিনতেন এবং স্থানীয় গোত্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এই দুজনের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী ফোরাতের দিকে এগোলো।
যুদ্ধের আগে একটি সিদ্ধান্তই পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ফোরাত নদীর ওপর একটি সেতু ছিল, আর সাসানিদ বাহিনী নদীর ওপারে অবস্থান নিয়েছিল। বর্ণনায় আছে, সাসানিদরা প্রস্তাব দিয়েছিল — হয় মুসলিমরা সেতু পেরিয়ে ওপারে আসবে, নয়তো তাঁরা নিজেরা এপারে আসবে। আবু উবাইদ সেতু পেরিয়ে ওপারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, যাতে শত্রুকে নিজের ভূমিতে চাপে রাখা যায়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ঝুঁকি ছিল বড়। সেতু পেরোনোর পর পিছু হটার পথ থাকবে মাত্র ওই একটি সেতু। আর শত্রুপক্ষের হাতে ছিল এমন একটি অস্ত্র, যার মোকাবিলা আরব যোদ্ধারা আগে কখনো করেননি।
সেই অস্ত্র ছিল যুদ্ধের হাতি। সাসানিদ বাহিনী হাতির পিঠে হাওদা বসিয়ে, তাতে তীরন্দাজ তুলে যুদ্ধ করতো। হাতির বিশাল দেহ, গর্জন আর গন্ধ আরবের ঘোড়ার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা ছিল। ঘোড়াগুলো ভয় পেয়ে এলোমেলো ছুটতে লাগলো, সারি ভেঙে গেল। মুসলিম যোদ্ধারা হাতির মুখোমুখি হতে গিয়ে দেখলেন, তীর হাতির মোটা চামড়ায় তেমন কাজ করছে না। আবু উবাইদ নিজে সামনে এগিয়ে গেলেন, একটি হাতির সঙ্গে লড়তে গিয়ে শহিদ হলেন। তাঁর পর একে একে আরও কয়েকজন সেনাপতি নিহত হলেন। নেতৃত্বের এই ধাক্কা বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিলো, আর সৈন্যরা সেতুর দিকে ফিরতে লাগলো।
সেই মুহূর্তে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটলো। পালানোর পথ, অর্থাৎ সেতুটি, কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে গেল — বর্ণনায় সেতু কেটে দেওয়ার কথাও আছে। ফলে বহু যোদ্ধা নদীতে পড়ে গেলেন, কেউ সাঁতরে পার হতে গিয়ে ডুবে গেলেন, কেউ শত্রুর আক্রমণে নিহত হলেন। মুসান্না ইবনে হারিসা তখন বাকি সৈন্যদের নিয়ে পিছু হটার চেষ্টা করলেন এবং সেতু আবার ব্যবহারের উপযোগী করার চেষ্টা করলেন বলে বর্ণনা আছে। তাঁর দৃঢ়তার কারণেই পুরো বাহিনী ধ্বংস হয়ে যায়নি। তবু এই পরাজয় ছিল মুসলিমদের ইরাক অভিযানে প্রথম বড় ধাক্কা, আর মদিনায় খবর পৌঁছলে সবাই মর্মাহত হলেন।
কিন্তু এই পরাজয় থেকে মুসলিমরা শিক্ষা নিতে দেরি করেননি। খলিফা উমর (রা.) মুসান্নাকে সাহায্য পাঠালেন, নতুন বাহিনী সংগ্রহ করা হলো, আর হাতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল নতুন করে ভাবা হলো। এর পরের বছর বুওয়াইবের যুদ্ধে মুসলিমরা উল্টো কৌশল নিলেন — তাঁরা সাসানিদ বাহিনীকে সেতু পেরিয়ে আসতে দিলেন, তারপর পেছনের পথ বন্ধ করে তাঁদের ঘিরে ফেললেন। সেখানে মুসলিমরা বিজয় পেলেন। আর কাদিসিয়ার যুদ্ধে হাতির মোকাবিলায় তীরন্দাজ দিয়ে মাহুতদের লক্ষ্য করা, হাতির চোখ ও পায়ের দিকে আক্রমণ করা এবং হাতিকে দলছুট করার মতো কৌশল কাজে লাগানো হলো। সেতুর যুদ্ধের কঠিন শিক্ষা ছাড়া এই পরবর্তী বিজয়গুলো এতটা পরিকল্পিত হতো কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। পরাজয় কখনো কখনো বড় শিক্ষক হয়ে ওঠে — সেতুর যুদ্ধ তারই প্রমাণ। এই পরাজয়ের পর মদিনা থেকে ইরাকে বার্তা গেল যে হাল ছাড়া যাবে না। মুসান্না ইবনে হারিসা বাকি সৈন্যদের নিয়ে সীমান্ত ধরে রাখলেন, স্থানীয় গোত্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখলেন, আর নতুন বাহিনী আসা পর্যন্ত ময়দান ছাড়লেন না। এই ধৈর্যই ইরাক অভিযানকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। একটি যুদ্ধে হার মানেই অভিযানে হার নয় — এই সত্যটি সেতুর যুদ্ধের পর মুসলিম নেতৃত্ব আবার প্রমাণ করলেন। পরের বিজয়গুলো তাই শুধু কৌশলের বিজয় ছিল না, ছিল ভেঙে পড়েও আবার দাঁড়ানোর বিজয়। সেতুর যুদ্ধে শহিদ হওয়া যোদ্ধাদের স্মৃতি মুসলিম বাহিনীকে আরও সতর্ক ও সংকল্পবদ্ধ করেছিল। তাঁদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি — তা পরের সেনাপতিদের শিখিয়েছিল, কোনো ভুল দ্বিতীয়বার করা যাবে না। এই সতর্কতাই কাদিসিয়ার ময়দানে বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল।
*পরের পর্বে: মারজুর রুমের যুদ্ধ (৬৩৫) — শামের পথে আরেকটি বিজয়।*














No comments:
Post a Comment